লেখক/অনুবাদক: মহাদেব সাহা
বিষয় : কবিতা
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশকাল: ২০১০
আই.এস.বি.এন:
মূল্য: ১০০টাকা
বইটি আপনার কতখানি ভালো লেগেছে?:
দৈনিক সমকালের ১৭/০২/২০১০ সংখ্যায় মহাদেব সাহা নিজের বই নিয়ে যা লিখেছেন:
জীবনের সকল অনুভূতির কথা বলতে চাই
আমাকে ঠিক গ্রন্থ-প্রণেতা বলা যায় না; আমি পরিকল্পিত বই লিখি না, দুই-চার লাইন কবিতা লিখি। ছড়ানো-হারানো এইসব কবিতা কুড়িয়ে একত্র করি, তাকে বরং বলা যায়, ভাবের খাতা, ভাবনার বই নয়। এই লেখাগুলোই মুদ্রণ ও শিল্পীর সৃজনশীলতায় বই হয়ে ওঠে। আমি অবাকই হই, কখন লিখলাম এই বই? আমার কল্পনার মধ্যে বই থাকে না, থাকে পদ্য, থাকে পঙ্ক্তি, থাকে শব্দ, থাকে কিছু অনুভব। কবিতা লেখকের জন্য গ্রন্থকারের দাবি বোধ হয় ঠিক নয়। তাই আমি আমার কবিতা বলতে পারি, আমার বই বলা কি যায়, বলা কি উচিত? তবু পাকে-চক্রে আমি বই-প্রণেতা, আমারই বই বলি, প্রকাশিত গ্রন্থ বলি, বলে হয়তো সুখ পাই, এই সুখটুকুই তো কবির পুরস্কার। তা-ই নিয়েই পরম আনন্দে মেতে থাকি। বছর বছর এমনি হয়। বই লিখি না আমি, তবু বের হয় আমার বই। কী বলা যায় এই বই নিয়ে, এ তো আমার পরিকল্পিত বিন্যস্ত ভাবনারাশি নয়; এ হচ্ছে পদ্য, কবিতা। যখন যা মনে এসেছে, তা-ই লিখেছি, গদ্যে তার তা ব্যাখ্যা করা প্রায় সাধ্যাতীত। আমি কাজ করি কবিতার আড়ালের মধ্যে, সেখানে স্পষ্ট বলে কিছু নেই, অন্ধের চোখে যা দেখা যায়, তা-ই হচ্ছে কবিতা। দিনে দিনে ধরাছোঁয়ার বাইরে তা আমার মধ্যে অঙ্কুরিত হতে থাকে। চোখ মেলে আমি তার মুখ দেখতে পাই না, চোখ বুজে তা দেখতে পাই, স্বপ্ন থেকে, আকাশ থেকে পাওয়া বিমূর্ত অবয়বহীন প্রতিমা; আমার দুই চোখ ছেয়ে আছে, সারা মন ভরে আছে, আমি দেখতে পাই, দেখাতে পারি না, বুঝতে পারি, বোঝাতে পারি না_ এই তো আমার কবিতার বই। এবারের অন্ধের এই স্বপ্নখাতাটির নাম ‘অন্ধের আঙুলে এত জাদু’ কী বলা যায় এর বিষয়, এর অর্থ? জিজ্ঞেস না করলে আপন মনে বলতেই পারি, জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলতে পারি না, যেমন বলেছিলেন সেইন্ট অগাস্টাস। কবির জন্য তো তা আরও বেশি সত্য, রূপ দেখতে পাই, স্বরূপ বলতে পারি না। এক কথায় তাকে নাম দিতে পারি সৌন্দর্য-প্রতিমা, স্বপ্ন-প্রতিমা। বলতে চাইলে বলতে তো পারিই বহু কথা, বিষয়, আঙ্গিক, নতুন চিন্তা, ছন্দ, প্রকরণ, তার অভিনবত্ব, তার নির্মাণশৈলী, তার সানুপুঙ্খ বিবরণ, কিন্তু তা প্রকৃত সত্য নয়, অর্ধসত্য কিংবা বানানো বর্ণনা। কবির পক্ষে নিজের রচিত কবিতা নিয়ে এর বেশি কিছু বলার নেই, বলা ঠিক নয়। দিবারাত্রি হঠাৎ জেগে-ওঠা কত মুহূর্ত, কত বিদ্যুৎঝলক, কত আত্ম-উন্মোচন, তার বিশদ বিবরণ হয় না। কবিতার জন্ম হয় মনে, বাইরে আড়ালহীন গদ্যে তার প্রকাশ প্রায় অসম্ভব। করতে হয়তো পারি-ই, লেখা হয়তো যায়-ই পাতার পর পাতা, দিন-তারিখ-সময়, কোথায় লিখলাম, কেন লিখলাম, এইসব অজানা কথা, কিন্তু তার সব কি আমিই জানি? জানি না, আসল সত্য জানি না, এই না-জানা মুহূর্তের নাম কবিতা, কবিতার জন্মপঙ্ক্ত। কোন মুহূর্তে কীভাবে পেয়ে গেছি কোন পঙ্ক্তি, কীভাবে মনের মধ্যে জেগে উঠেছে এই মেঘ-রৌদ্র এই আলো-অন্ধকার, এই বর্ষা-বসন্ত আমি তাকে বলতে চাই অন্ধের আঙুলে ফোটা জাদু, জাদুর ফুল, এটুকুই মাত্র। আমার প্রিয় পাঠকেরা যাকে বলবেন আমার এবারের কবিতার বই, তাকে নিয়ে, এই লজ্জা নিয়ে, এই জানা-অজানা নিয়ে, এই স্বপ্ন-রহস্য নিয়ে যদি বলি এই আমার সব কথা, সব বলা, তা হলে কি ভুল হবে? কোনো মূর্তি আমার চোখের সামনে ছিল না, চোখের ভেতরে ছিল, এই তো আমার জীবনের সব না-বলা কথা, এই তো আমার সেই আশ্চর্য মুহূর্ত, আমি জোড় হাতে বহু দিনরাত্রি, কোটি কোটি বছর হয়তো তারই জন্য অপেক্ষা করে থাকি। আমার কবিতা কোনো সুস্পষ্ট-সুনির্দিষ্ট বক্তব্য তো নয়, এ হচ্ছে বৃক্ষহীন ছায়া-গাছের ফুল, সরোবরহীন মায়া-সরোবরের জল, আকাশহীন অনন্তের শিশির, এসবই আমার কবিতা, এসবই আমার এবারের কবিতার বই। এর বেশি স্পষ্টীকৃত করার উপায় নেই। সেই দুঃখ, সেই পরাজয়, সেই জয়, সেই আনন্দ কিন্তু হয়তো অভিনব, হয়তো নতুন, হয়তোবা নতুন নয়, তারপরও সে আমারই মনে জেগে-ওঠা ভোর, নতুন জগৎ। না, না, আর কিছুই বলা ঠিক হবে না নিজের বই নিয়ে, নিজের লজ্জা নিয়ে। আমার বই কোনো বই নয়, কিছু ছড়ানো ভালোবাসা, কিছু বিন্দু বিন্দু অশ্রু। যে কেউ একে এক কথায় নস্যাৎ করে দিতে পারেন, আমার কিছু বলার নেই, আমি সব মাথা পেতে নেব। কারণ এ হচ্ছে অন্ধের আঙুলের ব্যর্থ কিছু কাজ।
প্রচ্ছদ : কাইয়ুম চৌধুরী
No related posts.


