লেখক/অনুবাদক: কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়
বিষয় : প্রবন্ধ
প্রকাশক: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী
প্রকাশকাল: ২০০৯
আই.এস.বি.এন:
মূল্য: ২২০টাকা
বইটি আপনার কতখানি ভালো লেগেছে?:
প্রচ্ছদ : উত্তম সেন
বইটি নিয়ে আবু বকর সিদ্দিক মার্চ ১৮, ২০১০ তারিখের সংবাদ সাময়িকীতে “কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালান্তর দর্শন” শিরোনামে একটি আলোচনা লেখেন:
কোনো আর্দশ বা বিশ্বাস চিরদিন একইরকম আবেদন রাখতে পারে না। এক কালের নিশ্চিত বিশ্বাস সময়ের আবর্তে অন্য কালের মানুষের কাছে ধূসর হয়ে ওঠে। সৃষ্টির রহস্য স্রষ্টার উপস্থিতি সম্পর্কিত শিরোধার্য সব বিশ্বাসও অস্পৃৃশ্য বর্জনীয় হয়ে পড়ে পরবর্তী কোন প্রবক্তার অধিকতর গ্রহণযোগ্য ধর্ম বা তত্ত্বের প্রচারণায়। মানুষের চিন্তার উন্নতি ও সূক্ষ্মতর বিচার বিশ্লেষণের ক্ষমতাই যে এর মূলে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্ববোধের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। শোষণের বিরোধী সংগ্রামে অর্জিত বিজয়, সময়ের ব্যবধানে নতুন ধরনের শোষণ-নির্যাতনের সূত্রপাত করে। তাই বর্তমান সময়ে প্রগতিশীল বলে পরিচিত বিভিন্ন ধারণা, যেমন নারীবাদ, নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন। প্রযুক্তির প্রসার, জ্ঞানের উপকরণ প্রাপ্তি আর দূরত্ব ঘুচে যাওয়ায় মানুষ তার সঙ্কীর্ণ পরিচয়ের গ-ি পেরিয়ে অখ- পৃথিবীর একজন হিসেবে নিজের ও অন্যের অবস্থা অত্যন্ত নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচারের সুযোগ পেয়েছে।
কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘কথা কালান্তরের, প্রগতির’ বইয়ে এ রকমই কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত এ বইটিতে লেখক যেভাবে নারীবাদ, মৌলবাদ, ধর্ম ও স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তা আমাদের এ ব্যাপারগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবনার তাগিদ দেয়। নারী ও নারীবাদ নিয়ে কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথাবিরোধী নির্মোহ আলোচনা যে কোন পাঠকেরই দৃৃষ্টি কাড়বে।
সারাধণভাবে ধরা হয় নারীরা ক্ষমতাহীন, পৃথিবীর মোট সম্পদের মাত্র একভাগ নারীদের দখলে। এ বাস্তবতাটি মেনে নিয়েই কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় দেখাতে চেয়েছেন অঙ্কের হিসাবে যাই হোক না কেন পর্দার আড়ালে ক্ষমতার জিয়ন কাঠিটির নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নারীর দখলে। ছলা-কলা, বিলাসচাতুরীর মাধ্যমে নারী ক্ষমতা যাদের হাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ করে। নারীর ক্ষমতার বাহ্যিক রূপটা স্পষ্ট না হলেও ক্ষমতাধরকে নিয়ন্ত্রণ করাটা একেবারে সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রতীয়মান চধৎধফরংব খড়ংঃ-এ দেখা যায় ঝধঃধহ, শহড়ষিবফমব ভড়ড়ফ খাওয়ার জন্য ঊাব-কে প্ররোচিত করে। ঝধঃধহ হাজারটা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ঊাব-এর যুক্তিকে ভোতা করে। ঊাব শহড়ষিবফমব ঋড়ড়ফ খাওয়ার পর অফধস-কে খাওয়ানোর জন্য প্ররোচিত করে এবং সফলও হয়। এখানে লক্ষ্যণীয় ঝধঃধহ, অফধস-কে প্রতারিত করতে পারবে না বলেই ঊাব-কে বেছে নিয়েছিল। চধৎধফরংব খড়ংঃ-এ ঝধঃধহ-কে দেখানো হয়েছে মহাশক্তিধর হিসেবে, এড়ফ আর ঈযৎরংঃ-এর পর সবচেয়ে শক্তিধর যে ঝধঃধহ সেও অফধস-কে বশ করতে পারবে না বলে ধরে নিয়েছিল। আর ঊাব, ঈশ্বর যাকে নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছিল অফধস-কে সঙ্গ দেয়ার জন্য, খুব সহজেই সে অফধস-কে বিপথে নিয়ে গেল। চধৎধফরংব খড়ংঃ-এর ইড়ড়শ রী যাদের পড়া আছে তারা নিশ্চয়ই ঊাব-এর এই অপ্রকাশ্য শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না।
কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় হেনরিক ইবসেনের ডলস হাউজ নাটকের নোরার চরিত্র বিশ্লেষণ করেও নারীর এ অপ্রকাশ্য শক্তিকে দেখাতে চেয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নোরা কোনো সফল ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ বা ব্যাংক ম্যানেজার না হয়েও ‘স্পষ্ট ও পরিণত একজন অহংকারী তথা ক্ষমতার অধিকারী ও প্রয়োগকারী ব্যক্তি।’ তিনি লিখেছেন, ‘নোরারও রয়েছে টোরভা-ের মতোই ক্ষমতার বোধ। টোরভা-ের বোধের পাশাপাশি তা আরও বিচক্ষণ ও বিস্তারিত খোলামেলা সংঘাত এড়াতে গিয়েই নোরার ক্ষমতার রূপ ও স্থান ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। তা যে কম এমন কথা বলা যাবে না।’
তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারী মুক্তির ধারণায় নোরার গৃহত্যাগের তাৎপর্য অপরিসীম। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় নারীমুক্তির আন্দোলনে নোরার গৃহত্যাগের গুরুত্বের চেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন অন্যান্য মানুষের মতো নোরার ক্ষমতার প্রতি সহজাত আকর্ষণকে। তিনি দেখিয়েছেন নোরা আর তার স্বামীর মধ্যে ক্ষমতার যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলছিল তাতে অন্যকে নিজের হাতের পুতুল বানানোর এক সচেতন বা অসচেতন স্পৃহা নোরার মধ্যেও সদা জাগরিত ছিল। তাই, নিজেকে অন্যের হাতের পুতুল ভেবে নোরার গৃহত্যাগ পরিহাসেরই নামান্তর।
“তসলিমার ‘ক’ নিয়ে দুঃখজনক ভ্রান্তি” প্রবন্ধে কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্যের স্রষ্টা এমন একজন নারীকে নিয়ে লিখেছেন যাকে নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। তসলিমার লেখায় বারবার উঠে এসেছে ধর্ম, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতি ও ব্যক্তি জীবনের খোলামেলা বর্ণনা, যা তাকে বারবার করেছে বিতর্কিত। ফ্রান্সিস বেকন ‘ঙভ ঞৎঁঃয’ প্রবন্ধে বলেছেন যে, নির্ভেজাল সত্য (ঘধশবফ ঞৎঁঃয) আমাদের চোখকে ঝলসে দেয় এবং তা রূঢ়। সত্যে যদি মিথ্যার খাঁদ মিশানো হয় তাহলে তা আর্কষণীয় হয়ে ওঠে। তসলিমার ‘ক’-তে তার ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্কের খোলামেলা বর্ণনা হয় পাঠকের চোখকে ঝলসে দিয়ে অন্ধ করেছে, অথবা এই আর্কষণীয় বর্ণনা পাঠককে এমন মুগ্ধতায় ভরিয়েছে যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। তসলিমার অধিকাংশ লেখা সম্পর্কে অবশ্য একই কথা প্রযোজ্য। ধর্ম নিয়ে তীব্র সমালোচনা অথবা যৌন জীবন নিয়ে খোলামেলা বর্ণনা তসলিমার লেখাকে সাধারণ পাঠক হতে প-িতমহল পর্যন্ত বিতর্কিত করেছে। আর এসবের ফলে তার বর্ণিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এসব ব্যাপারে সামান্য সচেতনতা তার লেখাকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা দিত। ব্যক্তিগত সম্পর্কের বর্ণনাতেও লেখিকা হতে পারত আরও সংযমী। কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আলোচনায় যে সব ব্যক্তি তসলিমার লেখনিতে শুধু ‘আত্মযৌবনিক কামশাস্ত্র’ খুঁজে পান, তাদের মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতিসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ যে সব বিষয় নিয়ে তসলিমা লিখেছে সে দিকে দৃষ্টি দিতে বলেছেন।
মৌলবাদের বিস্তার আর মতপ্রকাশের সুযোগ কমে যাওয়ার শঙ্কার কথা বলেছেন তিনি, আফ্রিকার মৌলবাদের বিস্তার নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনি দেখিয়েছেন আমাদের দেশে যেখানে মৌলবাদ দ্রুত শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে সেখানে অনেক প্রগতিশীল বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবীও স্বাধীন মতপ্রকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে (“তসলিমার ‘ক’ নিয়ে দুঃখজনক ভ্রান্তি” প্রবন্ধে)। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর আশাবাদ ইয়োরুবা প্রবাদটির মতো, ‘কাউকে নিজের মতো করার প্রয়াস সে ব্যক্তিকে অপ্রীতিকর ব্যক্তিতে পরিণত করে।’
আলোচনার শুরুতে বলেছিলাম সমস্যাগুলোকে নির্মোহ, যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টিতে বিচার করতে হবে। কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় নারীবাদ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী আলোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন বৈষম্য-বঞ্চনার বিরোধিতা প্রতিবাদের ধারায় যে নারীবাদের জন্ম, তা নিজেই এখন অনেক বঞ্চনার জন্ম দিচ্ছে। লেলিন যেমন বলেছিলেন ‘ঞযব ড়ঢ়ঢ়ৎবংংবফ ধৎব ঃযব ঢ়ড়ঃবহঃরধষ ড়ঢ়ঢ়ৎবংংড়ৎং’। যে বাংলা ভাষার জন্য একসময় আমরা রক্ত দিয়েছি, সেই বাংলা ভাষাই এখন সংবিধানের একমাত্র স্বীকৃত ভাষা, অথচ বাদবাকি ৪৬টি ভাষার কোনো স্বীকৃতি দিচ্ছি না আমরা। আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা তাই অপরিসীম। কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,
‘গোড়ামী, রক্ষণশীলতা ইত্যাদি প্রশ্নে আপন দেশবাসী কিংবা সম্প্রদায়কে কষাঘাত করতে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুয়ের কেউই দ্বিধা করেননি। বেগম রোকেয়ার নারীবাদও এ কারণেই বিশিষ্ট, তা শুধু আঙুল তুলেই শেষ করেনি; নারীদের অনেক ব্যর্থতা, আপন সম্প্রদায়-সদস্যদেরও রোকেয়া একই উচ্চকণ্ঠে নির্দেশ করেছেন।’
[এক পূর্ণ গ্রাস : জন্মদিনে পুনর্দর্শন]
বইটি প্রবন্ধ সংকলন হলেও কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় যে একজন কবি তার পরিচয় পাওয়া যায় সহজেই। কোনো কোনো প্রবন্ধের ভাষা কাব্যধর্মী আবার কোনো কোনো বাক্য গঠনে দেখা যায় কবিতার ভাষা। নিঃসন্দেহে কাব্যধর্মী ভাষা বইটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।
নারী, নারীবাদ ও ক্ষমতা নিয়ে কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোচনা অনেকেরই গাত্রদাহের কারণ হতে পারে। তবে তিনি যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ আলোচনা করেছেন তার যথার্থ উপলব্ধিই হতে পারে বইটির জন্য সর্বোত্তম শুভ কামনা।
No related posts.


