লেখক/অনুবাদক:
বিষয় :
প্রকাশক:
প্রকাশকাল: ২০১০
আই.এস.বি.এন:
মূল্য: ০টাকা
বইটি আপনার কতখানি ভালো লেগেছে?:
হুমায়ুন আহমেদ: কিছু লেখক এবং প্রকাশককে দেখলাম ঐতিহ্য নিয়ে চিন্তায় অস্থির। ঐতিহ্য বজায় রাখতেই হবে। মেলা বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণেই হতে হবে। অন্য কোথাও হওয়া যাবে না।
গায়ে গা লাগিয়ে মানুষ হাঁটছে। বই হাতে নিয়ে দেখার সুযোগ নেই। বাচ্চারা ভিড়ে অস্থির হয়ে কাঁদছে। কেউ কেউ হারিয়ে যাচ্ছে। বখাটে ছেলেরা থাকছে যদি সুযোগ বুঝে কোনো তরুণীর গায়ে হাত রাখা যায়। তসলিমা নাসরিন দেশে নেই। তরুণী লাঞ্ছিত হলেও লেখার কেউ নেই। লাঞ্ছিত হলেও ঐতিহ্য তো বজায় থাকবে।
টিভিতে বইমেলা দেখে আমি মাঝে মাঝেই আতঙ্কে অস্থির হয়েছি। যদি আগুন লাগে, যেখানে আগুন লেগেছে সেখানে কি দমকলের গাড়ি পেঁৗছতে পারবে? ছোটাছুটি শুরু হলে বাচ্চারা কোথায় যাবে? কলকাতার অতি প্রশস্ত বইমেলাও একবার আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল। সে সময় আমি কলকাতার বইমেলায়। কী ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়েছিল আমার জানা আছে।
ঐতিহ্য-প্রেমিকদের বলছি, ঐতিহ্যও বদলায়। একসময় আমাদের পূর্বপুরুষরা ধুতি পরতেন। ধুতি পরার ঐতিহ্য থেকে আমরা সরে এসেছি। আগের লেখকরা ঝর্না কলমে লিখতেন। এখন অনেকেই কম্পিউটারে লেখেন। ঝর্না কলম নামক ঐতিহ্যের মৃত্যু।
বাংলা একাডেমীর পাশেই বিশাল মাঠ পড়ে আছে। সেই মাঠ কারো চোখে পড়ছে না। আমরা আটকে আছি খুপরিতে। বাংলা একাডেমীর কর্তারা কেন মেলা পরিচালনা করছেন তাও বুঝতে পারছি না। মেলা পরিচালনা করবেন প্রকাশকরা। নীতি তাঁরা নির্ধারণ করবেন।
বইমেলায় হেঁটে বেড়ানো, নতুন প্রকাশিত বই হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার আনন্দ থেকে বাংলা একাডেমী পাঠককে বঞ্চিত করছে। মেলা তাঁদের হাতের মুঠোয় রেখে দিয়েই কাজটা করছে। – ফাউনটেনপেন
সূত্র: সমকাল, মার্চ ০৫, ২০১০
সৈয়দ আবুল মকসুদ: আমাদের বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের একুশে বইমেলা নিয়ে বড় বেশি কথা হয়। কথা বলেন লেখক, প্রকাশক, পাঠক, প্রচ্ছদশিল্পী; এবং যাঁরা বই কেনেনও না, পড়েনও না; মেলায় ঘুরে বেড়ান—সেই সব ভবঘুরেও। পত্রপত্রিকার একটি কোনা তাদের কথা বলার জন্য একটি মাস বরাদ্দ থাকে। টিভি চ্যানেলেও দেয় কিছুটা সময়। হেনরি জেমস বা জেমস জয়েস বা টমাস মান সারা জীবনে যত সাক্ষাত্কার দিয়েছেন, আমাদের লেখকেরা ফেব্রুয়ারি মাসে মেলা সম্পর্কে তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি সাক্ষাত্কার দেন। পেঙ্গুইনের প্রতিষ্ঠাতা স্যার অ্যালেন লেন জীবনে কোনো সাক্ষাত্কার দেননি, আমাদের প্রকাশকেরা দেন ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন। লেখককে রয়্যালটির টাকা দেওয়ার চেয়ে সাক্ষাত্কার দেওয়া সহজ।
বিখ্যাত লেখকেরাও বলছেন, এটা ‘প্রাণের মেলা’। ফ্র্যাঙ্কফুর্ট, তেহরান, বেইজিং, দিল্লি বা কলকাতার বইমেলা প্রাণহীন জড় পদার্থের মেলা নয়। বিনা পয়সায় ঢোকা যায় বলে দলবেঁধে মেলার মধ্যে যতক্ষণ খুশি ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে প্রাণের প্রকাশ কিছু থাকলেও থাকতে পারে, অলস সময় কাটানোর প্রবণতার প্রকাশই বেশি ঘটে।
কেউ কেউ বলছেন, বাংলা একাডেমীর বইমেলা একুশের ‘প্রত্যক্ষ ফসল’। কথাটার মধ্যে সামান্য সারবস্তু আছে—সম্পূর্ণ সত্য নেই। একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে এই বইমেলার সম্পর্ক আছে, তার কোনো প্রমাণ নেই। তা হলে তো ১৯৫৩-তেই বইমেলা শুরু হতো। প্রকাশকদের উদ্যোগে এবং বাংলা একাডেমীর পৃষ্ঠপোষকতায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই বইমেলা বিকশিত হয়েছে গত তিন দশকে।…………
….বইয়ের আড়ং আর জাতীয় বইমেলা এক জিনিস নয়। যাঁরা যুক্তিতে বিশ্বাস করেন তাঁরা জানেন, কোনো রকম একুশের চেতনা ছাড়াই বাংলা ভাষা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সময় থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ১৯৫২ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এর চেয়ে বেশি উন্নতি করেছে কি না, তা যে তিন হাজার ৩৫৪টি নতুন বই ২৮ দিনে বইমেলায় এসেছে, তার দেড় হাজার নতুন লেখক বলতে পারবেন। আমার মতো লেখকের শুধু মনে হচ্ছে, কোনো রকম ভাষা আন্দোলন ছাড়াই বঙ্কিমবাবু, রবিবাবু, শরত্বাবু ও কাজী সাহেবেরা কী করে লিখতে পারলেন? ….
…বাঙালি উঠতি মধ্যবিত্ত প্রথম চাইত ঢাকায় একটু মাথা গোঁজার মতো বাড়ি। তারপর ১০ বছর যাবত্ চাইছে একটি গাড়ি। কয়েক বছর যাবত্ চাইছে নিজের প্রকাশিত একটি বই। সে বইও প্রকাশ করতে হবে মেলার মধ্যে—অন্য সময় নয়। শুধু তা-ই নয়। নজরুলমঞ্চে বইটির মোড়ক উন্মোচিত না হলে প্রকাশই বৃথা। কোনো কোনো বইয়ের প্রকাশনা উত্সবে যে খরচ হয়, ওই পরিমাণ টাকা অদ্বৈত মল্লবর্মণকে বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিলে তাঁরা আরও তিন বছর বাঁচতেন। নজরুলের পরিবার পেলে ছয় মাস একটু ভালো খেতে পারতেন। লেখক হওয়ার তালিকায় এখন অন্তত দেড় কোটি মানুষ অপেক্ষমাণ। বই প্রকাশের যে বেগ শুরু হয়েছে, তা বাংলা একাডেমীর বুলন্দ দরোজায় কে রুধিবে দিয়ে বালির বাঁধ? …
‘বাঙ্গালা নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ শীর্ষক বঙ্কিমচন্দ্রের একটি ১২-দফা ফতোয়া আছে। আমার বাবা সেটি আমার পড়ার টেবিলের সামনে টাঙিয়ে রেখেছিলেন। বঙ্কিমবাবুর বিরক্তিকর দফাগুলোর মধ্যে ছিল: ১. যশের জন্য লিখিবেন না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভাল হইবে না। লেখা ভাল হইলে যশ আপনি আসিবে। ২. টাকার জন্য লিখিবেন না। ইউরোপে এখন অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে, এবং টাকাও পায়, লেখাও ভাল হয়। কিন্তু আমাদের এখনও সেদিন হয় নাই। ৩. যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন।
চাটুজ্জে সবচেয়ে সর্বনাশা নসিহতটি করেছিলেন পাঁচ নম্বর দফায়। তাঁর ভাষায়: ‘যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাত্ ছাপাইবেন না। কিছুকাল ফেলিয়া রাখিবেন। কিছুকাল পরে উহা সংশোধন করিবেন। তাহা হইলে দেখিবেন, প্রবন্ধে অনেক দোষ আছে। কাব্য নাটক উপন্যাস দুই এক বত্সর ফেলিয়া রাখিয়া তার পর সংশোধন করিলে বিশেষ উত্কর্ষ লাভ করে।’ এখন যদি তিনি এই কথা নজরুলমঞ্চের গাছতলায় দাঁড়িয়ে বলতেন, স্লোগান উঠত: চাটুজ্জের চামড়া—। – বই ও বইমেলা: বাঙালির সৃষ্টিশীলতা ও জ্ঞানচর্চা
সূত্র: প্রথম আলো, ০২/০৩/১০
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: “এবার একুশের মাসে ঢাকায় অন্তত পনেরটা দিন থাকার ফলে আমার মনে হয়েছে, এই ভাষার মাসটাতেও এই ভাষাকে নিয়ে যতটা সংকীর্ণ রাজনীতি হয়, ততটা ভাষার ব্যবহার ও ব্যবহারিক ভবিষ্যৎ নিয়ে হয় না। দুঃখের বিষয়, বাংলা একাডেমীও সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকার ফলে এই সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলবাজির আবর্তে পড়ে গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে বাংলা একাডেমীর একুশের অনুষ্ঠানে এক ধরনের কথাবার্তা হয়; আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তা বদলে যায়। ব্যক্তিপূজার দ্বন্দ্বও অনেক সময় দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য ও তাৎপর্য বিশ্লেষণের চেয়ে দীর্ঘ আটান্ন বছর আগে কে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বা দেননি তা নিয়ে অনাবশ্যক বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। একদল একজনকেই একমাত্র হিরো সাজানোর চেষ্টা করেন। অন্যদল তার প্রকৃত অবদানকেও অস্বীকার করে নিজেদের রাজনৈতিক কুমতলব হাসিলের চেষ্টা চালাতে দ্বিধা করে না। এ জন্য তারা বাম তকমাধারী বুদ্ধিজীবীকে বা বুদ্ধিজীবীদেরও ব্যবহার করে। মাঝখানে একুশের মর্মবাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।………বাংলাভাষা নিয়ে আমার উদ্বেগ ও আশঙ্কা দেখে পশ্চিমবঙ্গের এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে বলেছেন, ‘আপনি খামোকাই রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছেন। এই গ্গ্নোবালাইজেশনের যুগে মার্কেট ইকোনমির ধাক্কায় যেখানে জাতিরাষ্ট্রের (হধঃরড়হ ংঃধঃব) সীমানাগুলোই ভেঙে পড়ছে, সেখানে তুলনামূলকভাবে অনুন্নত জাতীয় ভাষাগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে মাথা ঘামানো অনুচিত। উন্নত বিশ্বের ভাষাগুলোই এখন বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করবে। ভারত সুপার পাওয়ার হতে চলেছে। তার রাষ্ট্রভাষা হিন্দিও বিশ্বভাষায় রূপান্তরিত হবে। তার দাপটের কাছে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় নোবেল লরিয়েট রবীন্দ্রনাথের বাংলাভাষারও অবস্থা দেখছেন।’
আমি তার কথার প্রতিবাদ করেছি। বলেছি, বিশ্বায়ন যতকাল ধনবাদভিত্তিক থাকবে, ততকাল সে বিশ্ব ধনবাদের আগ্রাসনের স্বার্থে বিশ্বের ছোট-বড় অনেক রাষ্ট্রে ভাংচুর ঘটাবে; যেমন ঘটিয়েছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া প্রভৃতি দেশে। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্ব কি লোপ করতে পেরেছে? বরং তার সংখ্যা বেড়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে একাধিক জাতিরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। যুগোস্নাভিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া ভেঙেও তাই হয়েছে। জাতিসংঘে নতুন জাতিরাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়েছে। এই জাতিরাষ্ট্রের ভাষাও জাতিসংঘে উন্নত ভাষাগুলোর পাশে স্থান নিতে চাইছে।” – একুশের ভাবনা : বাংলাভাষা কি আরেকটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে পারবে?
সূত্রঃ সমকাল, ২১/০২/২০১০
বদরুদ্দীন উমর: “কোন মেলা, তা জাতির জীবনে যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক তাকে কেন্দ্র করে লেখালেখি ও প্রকাশনা এক অস্বাভাবিক ব্যাপার। কোন দেশেই এটা হয় না এবং এর পরিণতি কখনও ভালো হতে পারে না। বাংলাদেশেও তা হচ্ছে না। এর কারণ সৃষ্টিশীল অথবা প্রকৃত গবেষণামূলক কোন কাজ দিন-তারিখের দিকে তাকিয়ে কেউ তা করে না। সেভাবে কেউ চেষ্টা করলে তার ফলে সৃষ্টিশীলতা ও গবেষণা দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” – বাংলা একাডেমীর বইমেলা ও বইয়ের জগৎ
সূত্রঃ যুগান্তর, ২১/০২/১০
ড. এম শমশের আলী: ” বেশ কিছু দিন আগে কলকাতায় বিজ্ঞান লেখার ওপর একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং বাংলাদেশ থেকে ড. আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন, ড. আলী আসগর, ড. শহীদুল ইসলাম গিয়েছিলেন ওই সম্মেলনে। আমিও ছিলাম। এসেছিলেন দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। সাগরময় ঘোষ হঠাৎ আল-মুতী শরফুদ্দিনকে বললেন ‘আপনারা যে এত পরিভাষার কথা বলছেন, বলুনতো depolarization -এর বাংলা কী করবেন?’ শরফুদ্দিন সাহেব ঠিক এ প্রশ্নটির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাই একটু থতমত খেয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করলেন। সাগরময় ঘোষ এবার আমাকে প্রশ্ন করলেন ‘আপনি কী বলেন?’ আমি বললাম এটি এক কথায় না বলে অনেক শব্দ ব্যবহার করে ঘটনাটি ভাঙচুর করে বলাই শ্রেয়। তখন এ ধরনের ‘ঘটনাকে’ বলা যায় depolarization। আমি এ প্রসঙ্গে পরিভাষা সম্পর্কে আমার মতামত প্রকাশ করলাম। সাগরময় ঘোষকে লক্ষ করেই বললাম ‘ধরুন আপনি চৌরঙ্গীকে (কলকাতার একটি ব্যস্ততম ও জনাকীর্ণ স্খান) গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ আপনার গাড়িটাকে ট্রাফিক লাইটে থামাতে হলো কিন্তু পরে গাড়ি আর start হচ্ছে না। ড্রাইভার চেষ্টা করেই যাচ্ছে, কিন্তু start হচ্ছে না। আপনি তখন ড্রাইভারকে বললেন, নেমে দেখ না কি হয়েছে? ড্রাইভার বনেট খুলে সব কিছু পরীক্ষা করে এসে বলল স্যার, ‘ব্যাটারি ডাউন’। এখন ড্রাইভার এ দুটো শব্দ বলে যা বোঝাতে চাইল আপনি ঠিক সেটাই বুঝলেন। এখানে কি ‘বিদ্যুৎকোষ শক্তিবিহীন’ বলার কোনো বিশেষ প্রয়োজন আছে? আমার একথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে ফেললেন।” – বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার
সূত্রঃ নয়াদিগন্ত, ২১/০২/২০১০
আনু মুহাম্মদ: “ইংরেজি ভাষা এখন শুধু একটি ভাষাই নয়, এটি একটি ক্ষমতার প্রতীকও। ইংরেজি ভাষা জানা মানে সেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া, এই ভাষা জানা মানে অনেক সুযোগের দরজা খুলে যাওয়া, এই ভাষা জানা মানে হীন দীন অবস্থা থেকে সমৃদ্ধ শক্তিধর অবস্থায় পৌঁছে যাওয়া। বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা জানলে শুধু ক্ষমতার স্বাদই পাওয়া যায় তা নয়, কর্মসংস্থান ও উপার্জনের বিভিন্ন রাস্তার সঙ্গেও তার যোগ প্রত্যক্ষ। ইংরেজি ভাষা জানা না থাকলে জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ, বিশ্বের খবরাখবর, এমনকি শিল্প সাহিত্য চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলা ভাষায় এগুলোর স্বচ্ছন্দ রূপান্তরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়নি।
বাংলা ভাষার তাহলে সমস্যা কী? বাংলা ভাষায় এই কাজগুলো হয় না কেন? এটা কি ভাষার গাঠনিক সমস্যা না এই ভাষা যে সমাজের, তার অবস্থান ও গতিপ্রকৃতির প্রকাশ? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে অন্যান্য ভাষার এবং অন্য ভাষাভাষীদের অবস্থাও আমাদের দেখতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশের হিন্দি ভাষার কি একই অবস্থা? না। হিন্দি ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অধিপতি ভাষা। বিশ্বেও তার প্রভাব বাড়ছে। হিন্দি ভাষাতে বিভিন্ন ভাষা থেকে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত এবং শক্তিশালী থাকায় কেউ শুধু হিন্দি ভাষাভাষী হলেও তার বিশ্ব-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা নেই। ইংরেজির দাপট সেখানেও আছে কিন্তু হিন্দি পাল্টা দাপটের জায়গাও তৈরি করেছে। পাশাপাশি হিন্দি ভাষা ভারতের মধ্যেও অন্যান্য ভাষার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কারণ হিন্দিভাষী একচেটিয়া মালিকদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক আধিপত্য বাড়ছে। আরবি ভাষাভাষীদের অবস্থাও অতটা করুণ নয়। এই ভাষাটিও সচল, সক্রিয় এবং বিশ্বের গতিধারাকে ধারণ করার মতো গতিশীলতা সেখানে আমরা দেখি। চীনা ও জাপানি ভাষা এখন বিশ্ব পরিসরে পাল্টা ক্ষমতার জায়গা তৈরি করছে। কম্পিউটার থেকে শুরু করে জাতিসংঘ পর্যন্ত সর্বত্র এই চেষ্টা উপলব্ধি করা যায়। এ ছাড়া কোরিয়া বা থাইল্যান্ডও ইংরেজি দিয়ে ভেসে যায়নি। এসব দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব ভাষা নিয়ে যুদ্ধ করে টিকে থাকছে, বিকশিত হচ্ছে।” – ন্তিক ভাষা বাংলা ও মাতৃভাষার অধিকার
সূত্রঃ প্রথম আলো, ২০/০২/১০
অরুণাভ সরকার: “এই নৈরাজ্যের কিছু উদাহরণ দেখা গেল সে দিন (১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১০) একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের নিমন্ত্রণ পেয়ে। খামের ওপরের লেখা ‘জাহিদ আকবর চৌধুরী’র কাব্যগ্রন্থ অন্তরে বাহিরে’। চৌধুরী পদবির পরে ঊর্ধ্বকমা (’) কেন? ইংরেজিতে পসেসিভ কেসে ঊর্ধ্ব কমা লাগে (যেমন জথভমশ’ঢ় দসসর); কিন্তু বাংলায় লাগে না। যেমন আমার পতাকা, রফিকের বই ইত্যাদি। …..প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের (৭-১৩ জানুয়ারি, ২০১০) ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবের নামের বানানে ভুল দেখে চমকে উঠেছিলাম। এমন ভুল অবশ্য প্রতিদিনই দেখা যায়। তবু শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলে কথা! সংবাদপত্রে প্রকাশিত এই ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিব এই পাঁচজনের বাণী ছাপা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কারো নামের বানানই শুদ্ধ নয়। রাষ্ট্রপতির নাম আগে লেখা হতো জিল্লুর রহমান। এখন এই সজ্জন ব্যক্তির নামের আগে লেখা হয় মোহাম্মদ ভুল বানানে ‘মো:’। নামের শুধু এই অংশ সংক্ষেপে কেন? সংক্ষেপ করতে হলেও দিতে হবে বিন্দু চিহ্ন মো.। বিসর্গ (:) বাংলা অক্ষর। তা দিয়ে শব্দ বা নাম সংক্ষেপ করা যায় না। মন্ত্রী একজন চিকিৎসক ডাক্তার। লেখা হয়েছে ‘ডা:’। একই ভুল। ডা: হবে না, হবে ডা.। তা ছাড়া তিনি এবং প্রতিমন্ত্রী দু’জনই সংসদ সদস্য এম.পি.। এম অক্ষরের পর বিন্দু চিহ্ন দেয়া হয়েছে। কিন্তু পি অক্ষরের পর দেয়া হয়নি। তা ভুল। ক্রোড়পত্র প্রস্তুতকারীদের কী সামান্য শিক্ষাও নেই?! কোনো কোনো পত্রিকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম লেখা হয়, ‘ড. দীপুমণি’। তা ঠিক নয়। ড. হচ্ছে ডক্টরেটের সংক্ষেপ। দীপুমণি ডক্টরেট নন, ডাক্তার, সংক্ষেপে ডা.। ……..যেমন সৈয়দ শামসুল হক। তিনি আমাদের অন্যতম প্রধান কবি। আমি তার গদ্য-পদ্য দুই-ই খুব পছন্দ করি। তিনি সম্প্রতি একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন। ‘সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন। কপিটাও সম্ভবত তারই লেখা। টিভিতে বিজ্ঞাপনের তার বিখ্যাত কণ্ঠে শোনা গেল, ‘লুকিয়ে রাখা গুপ্তধন’। গুপ্তধন মানেই তো লুকিয়ে রাখা ধন। ভুলটা সম্ভবত লেখনিস্খলনের ফল। এই ফেব্রুয়ারি মাসেই অন্তত দু’টি বিজ্ঞাপনে দেখা গেল, ‘মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে’। মৃত্যুবার্ষিকীতে মৃত্যুকে অথবা তার মৃত্যুদিনকে স্মরণ করা যায়। কিন্তু বার্ষিকীকে কেন? বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গেই মনে পড়ে একটি কাহিনীচিত্রের নাম। বিজ্ঞাপনে লেখা থাকে ‘প্রিয়তমাষু’। স্ত্রী লিঙ্গে ষু হয় না, হয় সু। প্রিয়তমাসু অথবা প্রিয়তমেসু। ” – বাংলা ভাষায় নৈরাজ্য
সূত্রঃ নয়াদিগন্ত, ২১/০২/২০১০
মুনতাসীর মামুন: “অধিকাংশ পাঠক বই কেনে লেখকের নাম দেখে, বিষয়বৈচিত্র্য দেখে, বা যে লেখকের বই তাকে টানে। বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখকের গদ্য আমার ধারণা পাঠকদের পছন্দ নয়। একজন উঁচুদরের লেখক হতে পারেন, তাঁর ভাষা সাহিত্যে উদাহরণ হতে পারে, কিন্তু তাঁর বই পাঠক না-ও কিনতে পারে। বই একটি পণ্য। ক্রেতা পণ্য দেখেশুনে কিনবে। দু-একটি সাজিয়ে রাখার জন্য কিনতে পারে। লেখক যদি পাঠকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে না পারেন, তবে পাঠকের বয়েই গেছে তাদের বই কিনতে। সামগ্রিকভাবে, অনেকের ধারণা, পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের পাঠক এখানে বেশি। এর কারণ, সেখানকার লেখকদের নির্ভার গদ্য। হুমায়ূন আহমেদ বা জাফর ইকবাল যে পাঠকচিত্ত হরণ করেছেন, তার কারণ যতটা না বিষয় তারচেয়ে বেশি তাঁদের নির্ভার গদ্য।
আমাদের চোখে অনেক খ্যাতিমান লেখক আমার এ মন্তব্যে যারপরনাই অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কিন্তু সত্যটা হলো, তাঁদের পাঠক নেই। সাধারণ পাঠক। গুটি কয় এলিট পাঠকের চোখে তাঁরা খ্যাতিমান। কিন্তু সেই এলিট পাঠকেরাও বাংলা বই কেনেন কম। তাঁরা খ্যাতিমান হতে পারেন, তবে পাঠকহারা খ্যাতির কোনো অর্থ নেই। তা ছাড়া তাঁদের গ্রন্থে বিষয়বৈচিত্র্যের নিদারুণ অভাব। এখনো তারাশঙ্কর, মানিক বা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই বিক্রি হয়। কারণ, বিষয়বৈচিত্র্য; পাঠক আনন্দের সঙ্গে তাঁদের বই পড়তে পারে, পাঠককে তাঁরা ধরে রাখেন।
আমাদের প্রকাশকদের কেন্দ্র বাংলাবাজার। অধিকাংশ এখানে অ্যামেচার প্রকাশক। তাঁদের দোকানে যান, সেখানে তাঁদের সব বই পাবেন না, বই বিক্রির নিয়মিত হিসাব নেই, তাঁদের কোনো কপি এডিটর, নির্দিষ্ট প্রুফ রিডার নেই। পাশ্চাত্যে লেখক তাঁর পাণ্ডুলিপি এজেন্টকে দিয়েই খালাস। সেই পাণ্ডুলিপি বাজারে আসে অনেক ধাপ পেরিয়ে। সেখানে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা তারা গড়ে তুলেছে, তাই বই বিক্রির পরিমাণটা বেশি। এখানে কয়েকজন ছাড়া বাকি লেখকদের প্রায় সবাইকে বই প্রকাশের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে ভূমিকা রাখতে হয়। সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল এক অবস্থা। প্রকাশকদের মধ্যে একটি বড় অংশ আগে নোটবই, ধর্মীয় বই, চালু বইয়ের ব্যবসা করতেন। খানিকটা সম্মান অর্জনের জন্য পরে সৃজনশীল বই প্রকাশনায় এসেছেন। বই, আধুনিক জগত্, সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা তাঁদের কম। তাঁদের বিপণনব্যবস্থা খারাপ, পাঠকের হাতে বই পৌঁছায় না। বাংলা একাডেমীর বইমেলা যে জমজমাট হয়, তার একটা কারণ যতটা না একুশে ফেব্রুয়ারি, তারচেয়ে বেশি বইয়ের খারাপ বিপণনব্যবস্থা। অর্থাত্ পাঠক মেলায় এমন অনেক বই দেখতে পান, যেগুলো সম্পর্কে তাঁরা জানতেনই না।” – বই ও বইমেলা
সূত্রঃ প্রথম আলো সাহিত্য সাময়িকী, ২২/০১/২০১০
হাসনাত আবদুল হাই: “এখন একুশের উদযাপন দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমটিতে রয়েছে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, যা একুশের মধ্যরাত থেকে শুরু হয় এবং পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে থাকে। উদযাপনের এই অংশ চিরকাল এমনই থাকবে, এখানে পরিবর্তনের প্রশ্ন ওঠে না। দ্বিতীয় যে বিষয় এখন প্রাধান্য পাচ্ছে তা হলো বইমেলা। ফেব্রুয়ারির প্রথম তারিখ থেকে বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকে সারা মাসই বই মেলা করে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের কথা বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একুশের বাণিজ্যিকীকরণ। বইমেলা হোক, আরো বড় আকারে হোক, এ নিয়ে বিতর্ক নেই। তবে একুশের উদযাপনে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে বই মেলা হতে হবে কেন? হলেও সেই মেলায় সব ধরনের বই থাকবে কেন ? একুশে উদযাপনে বাংলা একাডেমীর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে যা বাণিজ্যিক বই মেলা দিয়ে পালন করা যায় না। প্রতিটি একুশের উদযাপনে বাংলা একাডেমীকে দেখাতে হবে বাংলা ভাষার উন্নতিতে এবং উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমসহ সর্বস্তরে এর ব্যবহারের জন্য কী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল এবং তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে। এই সম্পর্কে গবেষণা ভিত্তিক তথ্য পরিবেশের জন্য আলোচনা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করতে হবে। এখনো পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলা একাডেমীতে আলোচনা সভা হয় তবে সেই সব আলোচনার বিষয়ের মধ্যে ভাষার উন্নতি এবং উচ্চশিক্ষার মাধ্যম সহ সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারে অগ্রগতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে না। থাকলেও নিতান্তই দায়সারা ভাবে। এর পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। বাংলা একাডেমীকে তার মূল দায়িত্বের কথা মনে রেখে একুশের উদযাপনে কার্যকরী কর্মসূচি তৈরি করতে হবে। বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণে যে মেলা হবে সেখানে স্থান পাবে ভাষা ও ভাষা ব্যবহারের নানা বিষয় কেন্দ্রিক বই, গবেষণাপত্র, অভিধান, পরিভাষার বই এবং বিদেশী ভাষা থেকে বাংলায় প্রয়োজনীয় বইয়ের অনুবাদ। একইভাবে বাংলায় লেখা গুরুত্বপূর্ণ বইগুলি ইংরেজীতে অনুদিত হতে হবে যেন বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষার পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। বড় আকারের যে বই মেলা; তার ব্যবস্থা অবশ্যই থাকবে ফেব্রুয়ারিতে, তবে সেখানে উদ্যোক্তা হবে পুস্তক প্রকাশক সমিতি এবং পৃষ্ঠপোষক হিসেবে থাকবে গ্রন্থকেন্দ্র। এই মেলা বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে এসে একাডেমীকে তার বর্তমানের বাড়তি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিবে। এই ব্যবস্থা একুশের উদযাপনকে কেবল সময়োপযোগী করে তুলবে না, দায়িত্বের যৌক্তিক বিভাজনের জন্য এর ফলাফল হবে উত্তম।” – একুশে, কালে কালে
সূত্রঃ বিডিনিউজ২৪ মতামত বিশ্লেশন, মার্চ ০২, ২০১০
Related posts:


