ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে যে যার মতো প্রবাহিত করতে চাইছে: ভাষাযোদ্ধা আব্দুল মতিন

লিখেছেন:

আব্দুল মতিন। কমরেড। দীর্ঘদিন বাম রাজনীতিতে সক্রিয়। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তাঁর মূখ্য ভূমিকার কারণে সারাবিশ্বের বাংলা ভাষাভাষিদের কাছে ‘ভাষা মতিন’ বলে খ্যাত। ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের দুবালিয়া গ্রামে তাঁর জš§। জাত সংগ্রামী। শুধু ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ করেই নিষ্ক্রিয় থাকেননি তিনি। জীবন সায়াহ্নে এখনও স্বপ্ন রচনা করে চলেছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ১৯৯৯ সালের ৪ জানুয়ারি তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নাসির আলী মামুন।

নাসির আলী মামুন: মানুষের পেশার বিভিন্ন ধারা এবং সুযোগ থাকতে আপনি বাম রাজনীতিতে আসলেন কেন?
আব্দুল মতিন: আমারও জীবনটা খুব দুঃখে শুরু। ১৯৩৩ সালে মাত্র আট বছর বয়সে মারা যান আমার মা। বাবার আর্থিক অবস্থা দিনহীন। মাসিক মাত্র পনের রুপি বেতনে তিনি চাকরি করতেন দার্জিলিংয়ের জলাপাহাড় ক্যান্টনমেন্টে। কেরানির চাকরি। ১৯৩২ সালে আমরা তিন ভাই ও মা সেখানে বাবার সঙ্গে বসবাস করি। নানারকম উপেক্ষা আর দুঃখ-কষ্টে বড় হতে থাকি প্রকৃতির মধ্যে। মানুষ দেখি, নানা পেশার সাধারণ কর্মজীবী মানুষ। এদের সাথে কথাবার্তা বলে একটা সান্ত্বনা পেতাম। ভালো লাগতো সাধারণ মানুষ। শ্রমজীবী মানুষদের সবসময় আমি সম্মানের জায়গায় রেখেছি। আমি এন্ট্রান্স পাস করি ১৯৪৩ সালে দার্জিলিং গভ. হাইস্কুল থেকে। পাস করার পরে আমি দেখলাম যে এখানে তো অনেকদিন থেকেছি, বার-তের বছর; আমার নিজের দেশ এই সমতল ভূমি, এই গরিব দেশটাকে একটু দেখা দরকার। আমি দেশে আসি। হাল বাওয়া শিখি, নিড়ানি শিখি, নৌকাচালনা শিখি, সাঁতার শিখি। সাধারণ মানুষদের একটু দেখা-বোঝার চেষ্টা করি।
মামুন: শুরুতে আপনার স্বপ্ন কী ছিল?
মতিন: কৃষক হওয়াটাই আমার মোটামুটি একটা ইচ্ছে ছিল, হয়তো আর কিছু হতেও পারব না। আমি কোনোরকমে পাস করলেও করতে পারি। তারপরে বাবার ওপর নির্ভরশীল থাকব না। আমাদের কিছু জমি আছে। এই জমি-টমি চাষ করে সাধারণ জীবনযাপন করব। আমার পাস করারও তেমন সম্ভাবনা ছিল না। কিছুদিনের মধ্যে টেলিগ্রাম পেলাম। তৃতীয় শ্রেণীতে পাস করেছি, চলে আসো। ইতোমধ্যে আমার বাবার অবস্থা কিছু ভালো হয়েছে। তিনি বললেন, তুমি ভালো কলেজে পড়, সেন্ট জেভিয়ার্সে। হোস্টেলে থাক। আমাদের বাসা থেকে অনেক দূর। দেখলাম, এই অবস্থার মধ্যে থাকা আমার পোষাবে না! বললাম, আমাদের দেশ সমতলভূমিতে, সেখানেই যাই।
আবার দার্জিলিং থেকে পাবনায় চলে এলাম। নদীভাঙনে আমাদের দুবালিয়া গ্রাম অনেক আগেই হারিয়ে যায়। তারপর যমুনায় জেগে ওঠা নতুনচরের শাইলজনা গ্রামে বসবাস শুরু করে আমাদের পরিবার। সেখানে কোনো কর্ম না থাকায় বাবা দার্জিলিং যেতে বাধ্য হন। ধুধু বালিয়ারচর প্রায় জনমানবহীন, আমার দেখা দরিদ্র মানুষগুলোর জীবন-সংগ্রাম আমাকে শিক্ষিত করতে থাকে। আস্তে আস্তে সেখানে মানুষজন সমবেত হয়। আমাকে তো কিছু পড়াশোনা করতে হয়। পাবনা ভালো লাগল না। সেখান থেকে চলে গেলাম রাজশাহী। ভর্তি হলাম রাজশাহী কলেজে। সেখানে দেখলাম বহু মুসলমান ছেলে বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে ভর্তি হয়েছে কলেজে। দার্জিলিংয়ে এত মুসলমান ছাত্র দেখিনি। তাদের কথাবার্তা শুনি, সকলেই পাকিস্তান সমর্থন করে! কেন তারা পাকিস্তান সমর্থন করে? মুসলমানদের রাষ্ট্র হলে ভালো হবে। পরে দেখলাম, আরে, পাকিস্তানের মধ্যে তো একটা সুযোগ আছে! পাকিস্তান হলে পরে আমরা তো পূর্বাঞ্চল হব। দুই অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান হবে। পূর্ব অঞ্চলে আমরাই হব শতকরা ছাপ্পান্নজন বা এরকম সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমরা তখন বললাম, সুযোগ সুবিধা না পেলে পরে বলব, আমরা তোমাদের সাথে থাকছি না। আমাদের সাত-আট কোটি লোক যা হবে তা দিয়ে আমরা অনায়াসে একটা আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারব। একটা জনকল্যাণমূলক দেশ গড়ে তুলতে পারবÑএইটা মনে করে আমি তখন আর এর বিরোধিতা করলাম না। সেই হিসেবে মনে করলাম আগে পাকিস্তান হয়ে যাক তারপরে আমাদের বাংলার ব্যাপারটা এমনিতেই আসবে।
পাকিস্তান হলো। এর মধ্যে আমি রাজশাহী থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম ১৯৪৫ সালে, আর্টস গ্র“পে। তারপর ঢাকায় চলে এলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ পাসকোর্সে ভর্তি হলাম। থাকতাম ফজলুল হক হলে। খুব ভালো লাগল থাকাটা। আমি আস্তে-আস্তে এই বাংলাকে যাতে রাষ্ট্রভাষা করতে পারি এইভাবে আমাদের যাত্রা শুরু করার চিন্তা করি। অনেক লোকজনের সাথে পরিচয় হতে থাকে। আমি তখন সরাসরি রাজনীতিতে নামি নাই। অনেক পরে নামি। এই সিদ্ধান্তে আসলাম পরে যে মানুষের ভালো করতে গেলে এই সমাজটা পরিবর্তন করা দরকার। তো, কী সমাজ পরিবর্তন করব। যা দেখলাম, যে-ই বড় হয় সেতো আর সমাজ পরিবর্তনের কথা বলে না। সে তখন বলে যে এই সমাজটাই বজায় থাকবে। তার স্বার্থটা বজায় থাকবে যদি সমাজটা পরিবর্তন না হয়। সুতরাং সমাজ পরিবর্তন করার পক্ষপাতি সে না।
মামুন: রাজনৈতিক সংগঠন বা শক্তি ছাড়া সমাজের পরিবর্তন করতে চাইলেন!
মতিন: হঠাৎ মনে হলো, এই যে অশিক্ষিত দরিদ্র মানুষ, এদেরই সমাজের পরিবর্তন চাওয়াটা স্বাভাবিক। যদি সমাজ পরিবর্তন করতে চায় এরাই করতে পারে। এরা তো একটা পরিবর্তনকামী বড় শক্তি। আমার মাথায় এল রাজনৈতিক সংগঠনের চিন্তা। আমি তখন ছাত্র, পাস করি নাই। সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে যে-ই পার্টি সেটাই আমার করা দরকার।
মামুন: রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে আপনার অভিজ্ঞতার একটা চিত্র তুলে ধরেন। সেদিন আপনি কী করেছিলেন?
মতিন: খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা উত্থাপন করেছেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে যে যার মতো প্রবাহিত করতে চাইছে। অনেকেই নিজেকে গ্লোরিফাই করার জন্য সত্যকে চাপা দিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করেছে। গাজীউল হক সাহেবও আজকাল পত্র-পত্রিকায় মিথ্যা কথা বলেন। তিনি নেতা ছিলেন। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন হয়নি। অসত্য তথ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসকে বিভ্রান্ত করছেন।
আমি তখন ইউনিভার্সিটি থেকে বহিষ্কৃত হয়েছি, ১৯৪৯ সালে। থাকতাম ফজলুল হক হলের পাঁচ নাম্বারে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিু বেতনের কর্মচারীরা একটা আন্দোলন করেÑআমরা এত কম বেতন পাই আমাদের বেতন বাড়ানো দরকার। কর্তৃপক্ষ রাজি না। তখন তারা ধর্মঘট করে। তা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষ থেকে তাদের সমর্থন করি। তারা একটা মিছিল বের করে। মিছিলে আমরাও যোগ দেই। সচিবালয়ে যাই মন্ত্রীর কাছে দাবি পেশ করার জন্য। তখন প্রধানমন্ত্রী নাজীমুদ্দিন সাহেব। সচিবালয়ের আগেই পুলিশ আমাদের আটকে দিল। আমি পুলিশের সাথে তর্কে লিপ্ত হলাম। বললাম, এটা স্বাধীন দেশ। কেন আমাদের দাবি পেশ করতে পারব না। আমরা যখন জোড় করে যেতে চাইলাম তখন আমাদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন।
মামুন: তিনি তো তখন রাজনীতি করেন, পরিচিতঃ
মতিন: তিনি আমার অনেক আগে থেকেই রাজনীতি করতেন। ওনার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অনেক দিনের। আরো অনেক রাজনীতিক ছিলেন। মিছিল করার কারণে আমাদের গ্রেফতার করল। দুই মাসের ডিটেনশন দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হলো। আমি গ্রেফতার হওয়ার কিছু আগে সিএসপি পরীক্ষা দিয়েছিলাম, পাকিস্তানের সেকেন্ড ব্যাচ। প্রথম প্রশ্নপর্ব ইংরেজি ছিল, একটা রচনা আড়াইশ নম্বর। আমি আড়াইশ নম্বরের ওই রচনাটা লিখলাম। একটা রচনা আড়াইশ! মানে এরা জানতে চায় ইংরেজি-টিংরেজি কিছু জানি কি না। আমি সেভাবেই একটা রচনা বেছে লিখলাম। ‘কাল্ট অব সুপারম্যান’। আমি আবার ‘কাল্ট’ শব্দের মানে নিশ্চিত জানতাম না। ভাবলাম যে কাল্ট বোধহয় কালচারের কাছাকাছি কোন অপভ্রংশ হবে। সেভাবেই একটা রচনা লিখলাম। লিখে চার ঘণ্টা পরীক্ষা শেষ করে ফজলুল হক হলের পাশে কার্জন হলে অভিধান খুলে দেখলাম এটার মানে তো অন্য! আমি বুঝতে পারলাম পাস করতে পারব না। সিদ্ধান্ত নিলাম বাকি পরীক্ষা দেব না। বারশ’ নম্বরের আরও পরীক্ষা ছিল আমি দিলাম না।
জেলের মধ্যে একদিন আমাকে জানানো হলো, আপনি সিএসপিতে কোয়ালিফাইড হয়েছেন। আপনি এই কাগজে একটা সই দেন, আপনাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। জেলখানার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে ছিলাম। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন। একটা বড় ওয়ার্ডে সবাই ছিলাম। যখন বলা হলো সই করতে আমি দেখলাম, একটা জায়গায় লেখা আছে ‘আই শ্যাল সার্ব এনি গভর্নমেন্ট দ্যাট কামস্ টু পাওয়ার মোস্ট ওবিডিয়েন্টলি অ্যান্ড সাবসার্বিয়েন্টলি।’ মনে করলাম, সরকার আসবে জুলুম অত্যাচার করবে তাকে ওবিডিয়েন্টলি মেনে নেব! এটা কী রকম একটা দাসত্ব! এটা লিখে দেয়া হবে। এর ব্যতিক্রম করা যাবে না। এর চাইতে চাকরি না করাই ভালো। আমি সই করলাম না। জেলগেটের অফিস থেকে অবাক হওয়া জেল পুলিশ অফিসার আমাকে আবার ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দিল। তারপর পনের-বিশ দিন পর টার্ম শেষ হলে আমি জেল থেকে বেরিয়ে আসলাম।
মামুন: জেলে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আপনার কী ধরনের যোগাযোগ ছিল?
মতিন: শেখ মুজিবকেও একই কারণে জেলে যেতে হয়েছিল। তখন সে ছাত্রলীগ করে। আটচল্লিশ সালের মার্চ মাসে তাঁর সঙ্গে আমি পরিচিত হই। তিনি কথাবার্তায় ভালোই ছিলেন। বেশ সাহসী। তিনি জেলে সবার সঙ্গে কথা বলতেন আর সাহস দিতেন। জেলের মধ্যে রাজনৈতিক কথা বলতে ভয় পেতেন না। তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের শিষ্য। কলকাতায় বড়-বড় নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও ঘটনা আমাদের বলতেন। আমরা সবাই গ্রাম থেকে এসেছি। তিনিও গ্রামের ছেলে। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার আগেই তিনি কলকাতায় ছিলেন। বড় বড় নেতাদের সঙ্গে ঘুরেছেন। তার অভিজ্ঞতা আমরা শুনতাম। জেলের পুলিশরা তাঁকে ভয় পেত সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কারণে।
মামুন: ১৯৪৮ সালে যখন জিন্নাহ ঢাকায় এলেন আপনাদের প্রস্তুতিটা কেমন ছিল?
মতিন: আটচল্লিশ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মাথায় টুপি ও সেরওয়ানি পরা জিন্নাহ সাহেব বক্তৃতা দেয়ার সময় যখন পাকিস্তানের একমাত্র সরকারি ভাষা উর্দু করার ঘোষণা দিলেন তখন প্রতিবাদ করতে চাইলে পাশে থাকা আমার সহপাঠিরা বিরত থাকতে বললেন। তবে অনেকেই সরবে সেদিন প্রতিবাদ করে এবং বাংলার পক্ষে রায় দেয়।
এসময় আমাদের কোন রকম প্রস্তুতি ছিল না। তবে বাংলাকে যে আমরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দেখতে চাই এটা ছিল উপস্থিত সবার প্রাণের দাবি।
২৪ মার্চ ছিল কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন। জিন্নাহকে প্রধান অতিথি করলেন ভাইস চ্যান্সেলর। বহু কষ্টে ২০ টাকা যোগাড় করলাম সমাবর্তনের পোষাক নেয়ার জন্য। আমার মনে হয়েছিল ভাষা নিয়ে তিনি যখন সমাবর্তনে উর্দুর পক্ষে কথা বলবেন তখন প্রতিবাদ করব সবার সামনে। কার্জন হলে জিন্নাহ যখন উর্দুর পক্ষে বলছিলেন আমি দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করি। জিন্নাহ সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে, তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত লোকজনেরা সবাই তটস্থ। আমার কথার পরে সবাই আমাকে সমর্থন দিলেন। এমন অবস্থায় পড়লেন পাকিস্তানের জাতির পিতা অনুষ্ঠান শেষ না করে হলত্যাগ করতে বাধ্য হলেন! আমরা বাংলার পক্ষে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে থাকি।
মামুন: জেল থেকে বের হয়ে কী করলেন?
মতিন: জেল থেকে দুই মাস পর বের হলে ভাইস চ্যান্সেলর তাঁর অফিসে আমাকে ডেকে পাঠালেন। ড. মুয়াজ্জেম হোসেন। তিনিও আমাকে একটা লিখিত বন্ডে স্বাক্ষর দিতে বললেন। আমি বললাম, সরকার আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের সব দাবি মেনে নিয়েছেন, তাহলে আমাদের অপরাধটা কোথায়? আপনি তো জোর করে আমার কাছে আন্ডারটেকিং চাচ্ছেন। তিনি বললেন আমি অতো কথা শুনতে চাই না, তোমাকে আন্ডারটেকিং দিতে হবে আর ডিসিপ্লিন মানতে হবে। সেই ডিসিপ্লিন তো আজকাল ইউনিভার্সিটিতে দেখছি, কি ডিসিপ্লিনে চলছে! এই অবস্থায় আমি বললাম এই অন্যায় বন্ড আমি মানতে পারব না। আমাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করল।
এই তিন বছর বহিষ্কার হওয়ার কারণে আমার কোনো কাজ থাকল না। বাড়িতে জানালাম না। আমি চলে গেলাম সিরাজগঞ্জে, যমুনা নদীর চরে। আমি ভাবলাম কে জানবে, তিন বছরের বহিষ্কৃত জীবন এখানে থেকে কেটে যাবে। ১৯৫০ সালে একবার ঢাকায় এলাম। একটা রেস্টুরেন্টে বসে চা খাচ্ছি, কয়েকজন বলছে, আরে ভাই ছাত্ররা ভাষা আন্দোলন করল, আটচল্লিশ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলন। এতবড় আন্দোলন, আমরা তাদের সমর্থন দিলাম। মিছিল করলাম। সেইটা হঠাৎ কেন বন্ধ হয়ে গেল। ছাত্ররাও তো আর কোনো কথা বলে না বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার। বাংলা যদি রাষ্ট্রভাষা না হয় আমরা তো একেবারে অশিক্ষিত থেকে যাব। আমরা চাকরি-বাকরিও পাব না, আমাদের কোনো উন্নতি হবে না।
কথাগুলো শুনে আমার মনের মধ্যে দারুণ শিহরণ হলো। তাইতো, ছাত্রদের ওপর এরা এত আশা করছে, অথচ ছাত্ররা কোনো ভূমিকা পালন করছে না। এর কয়েকদিন পর দ্বিতীয় বার্ষিকী। ১৯৪৮ সাল, তারপর ১৯৪৯ এবং ১৯৫০ সালঃ ১১ই মার্চ। সেখানে সভা হচ্ছে। তো আমি গেলাম সেখানে, আগে আমি কখনও বক্তৃতা করিনি। ওরা বলছে, আটচল্লিশ সালে আমরা এতবড় আন্দোলন করেছি, এই করেছি সেই করেছি। সেই অতীতে কী করেছি সেইসব কথা। কিন্তু কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। সভাপতির কাছে গিয়ে বললাম যদি অনুমতি করেনÑআমি কি দুইটা কথা বলতে পারি। তিনি বললেন, খুব সংক্ষেপে বলেন। আমরা তাড়াতাড়ি মিটিং শেষ করে দিব। কে সভাপতি ছিলেন আমার অতো মনে নাই। তিনি ছাত্র। আমি বললাম, আমার কথা অতি অল্প। এসব কথা না বলে ভবিষ্যতে যাতে আমরা আন্দোলন করতে পারি মানুষ এটা আশা করছে। আমরা যদি মানুষের আশা পূরণ করতে পারি, আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি তাহলে এটা বিরাট আন্দোলন হবে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলে আমাদের মর্যাদা হবে, মূল্য হবে। সেইটা করি সকলে মিলে। এই কথা বলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা প্রস্তাব গ্রহণ করল। তারা বলল, ওনার প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করেছি ওনাকে আহ্বায়ক করেন। আমি অহ্বায়ক নির্বাচিত হলাম ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ।
মামুন: আপনি তো তখন ছাত্র না, বহিষ্কৃত?
মতিন: ছাত্র না, কে জিজ্ঞেস করে! ইউনিভার্সিটি বহিষ্কার করেছে বলে ছাত্ররা কিন্তু তা গ্রহণ করছে না। আহ্বায়ক হয়ে আমি গোপনে ও প্রকাশ্যে কাজ আরম্ভ করলাম। তখন পুলিশের অতো নজরদারি ছিল না। আমার ক্লাস ছিল না। খাব কী, চলব কী করে! একটা টিউশনি করতাম চল্লিশ টাকার।
মামুন: কোথায় করতেন টিউশনি?
মতিন: এই ঢাকায় করতাম। আমার সেই সময়কার ছাত্র কামাল হোসেন। পরে প্রখ্যাত আইনবিদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার এক মামা আমার বন্ধু ছিলেন। তিনিই টিউশনিটা ধরিয়ে দিলেন। আমি প্রথমদিন গিয়ে দেখলাম একজন সুশ্রী তরুণ। জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কোন সাবজেক্ট ভালো লাগে। সে বলল, ইতিহাস ভালো লাগে। তো ইতিহাস পড়েছ। হ্যাঁ, অক্সফোর্ড হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া। সেন্ট গ্রেগরির ছাত্র। তখন আমি বললাম, দেখি তোমার বইটা। দেখলাম মোটা বই। সবটা তুমি পড়েছ। বললো, হ্যাঁ। আচ্ছা। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ কবে হয়েছে বলতে পার। একটু চিন্তা করে বলে দিল। আরও কিছু প্রশ্ন করলাম, সবই তার জানা। বললাম, তুমি তো ভালোই পড়াশোনা করেছ। দেখো তোমাকে তো আমি পড়ালে কোনো লাভ হবে না। খামাখা তোমার টাকাটা নষ্ট করব কেন? তুমি এমনি ভালো রেজাল্ট করবা। দশজনের মধ্যে তোমার স্থান হতে পারে। ও বলল, আপনি এসে গল্প করবেন। আমার তিনমাস আরও আছে ম্যাট্রিক পরীক্ষার। আমি মোটামুটি পড়ে ফেলেছি।
কামাল হোসেন ইলেভেন্থ হয়েছিল। ওর বাবা বলল, ইন্টামিডিয়েটে ভালো করবে। পরে ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম হয়েছিল। তারপরে আমি যখন জেলে, একজন পুলিশ ওয়ার্ডে এসে বলছে এক ব্যারিস্টার আপনার সাথে দেখা করতে চাচ্ছে। এটা সম্ভবত ১৯৬২ সাল হবে। আমি জেলগেটে গেলাম। আমার পায়ে ধরে সালাম করল একজন ইয়াংম্যান। বলল, আমি ব্যারিস্টারি পাস করেছি। আপনি কেমন আছেন। আমি আপনার পক্ষে একটা কেস করব। আমি বললাম, কী কেস করবা। বলল, একটা রিট পিটিশন করব। আমি বললাম, রিট পিটিশন দরকার হবে না। আমি যা দেখছিÑএখানে বোধহয় তখন আইউব খাঁ আসছেন। তিনি চীনের সঙ্গে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং করছেন। তো চীনের সঙ্গে যদি এটা হয়, তাহলে কমিউনিস্টদের ধরে রাখবে না। এটা চেঞ্জ হয়ে যাবে। তবুও বলা যায় না, তো তুমি করতে পার। ও করার আগেই জেল থেকে আমি ছাড়া পেলাম।
যেটা বলছিলাম, ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হতে পেরে নিজের ওপরে সাংঘাতিক একটা আস্থা এলো। আমি তো আহ্বায়ক। হলে হলে গিয়ে ছাত্রদের সংগঠিত করতে থাকি। বেশিরভাগ ছাত্র সমর্থন করে। কেউ কেউ বাংলা ভাষার গুরুত্ব বুঝতে না পেরে বিরোধিতা করেছে।
মামুন: ১৯৫২ সালে আপনারা কী করলেন?
মতিন: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় দেখলাম যে আমাদের যারা ভাষা আন্দোলন করছিঃ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মামুন: ৬৬ জনকে নিয়ে?
মতিন: না, ওখানে ছিল জনা চল্লিশেক, উনচল্লিশজন। মওলানা ভাসানী ছিলেন, আতাউর রহমান ছিলেন, কাজী গোলাম মাহবুব কনভেনার। আমি ইউনিভার্সিটি কমিটি অব অ্যাকশনের পক্ষ থেকে একজন মেম্বার ছিলাম।
মামুন: শেখ মুজিব ছিলেন না কেন?
মতিন: ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ হলে তাতে যোগ দেয়। তখন তিনি জেলে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। কিন্তু বাঙালির ইতিহাসের সর্বকালের গুরুত্বপূর্ণ যে ঘটনাটি বাহান্নর ভাষা আন্দোলনÑতাতে তিনি সরাসরি যুক্ত হতে পারেননি। জেলে ছিলেন। ছাত্ররা আন্দোলন করেছে। জাতীয় নেতারা সমর্থন দিয়েছে। কমিটিতে তাদের নাম ছিল।
মামুন: তারা সক্রিয় ছিলেন না?
মতিন: মওলানা ভাসানী বাদে কেউ অনিবার্য সাড়া দেননি। কমিটির অনেকেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। শুধু তাদের নাম থাকত কমিটিতে। এখন এসব কথা বলতে গেলে অনেকে পছন্দ করবেন না, বলবে আব্দুল মতিন আবার কী বলে! আমি আন্দোলনের শুরু থেকে ভেতরে এবং সামনের কাতারে ছিলাম। এখন অনেকে মিছা কথা বলে, সাক্ষাৎকার দেয়। বিভিন্ন জেলায় দেখা যাচ্ছেÑ ভাষা আন্দোলন করেছে এমন দাবি করছে। এদের বেশিরভাগকেই আমরা দেখি নাই।
মামুন: আপনি মওলানা ভাসানীর দল করতেন। হয়তো সেকারণে তাঁর প্রতি পক্ষপাত আপনার?
মতিন: মওলানা ভাসানী শুধু আমার নেতা ননÑ তিনি এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সর্বহারা মানুষদের নেতা। এত ত্যাগী নেতা আমাদের কালে আর দেখিনি। তিনি শুধু ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন দেননি, এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের চ্যালা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, তিনিও মওলানা সাহেবকে কোনদিন অবজ্ঞা করেননি। আওয়ামী লীগের খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের বইটা আপনারা পড়েন নাই! পড়লে বুঝবেন মওলানা কত বড়মাপের জাতীয় নেতা ছিলেন। অনেক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, জš§ দিয়েছেন। ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ পড়ে দেখবেন পশ্চিম তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করত।
মামুন: তারা তো তাঁকে ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’ খেতাব দিয়েছিলঃ
মতিন: দিয়েছিল। আবার ফুলের মালা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে নাই। শেখ মুজিবুর রহমান কোনোদিনই প্রকাশ্যে তাঁর বিরোধিতা করেন নাই। তিনি জানতেন মওলানা ভাসানীর মতো নেতা না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হতো না! এত ত্যাগ আর কে করেছে এই দেশে?
মামুন: সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মূল্যায়ন এখন কীভাবে করেন?
মতিন: আমাদের ছাত্রদের আন্দোলনকে তারা আরও বলিষ্ঠ করেছেন।
মামুন: কিন্তু বললেন যে কেউ কেউ ছিলেন নিষ্ক্রিয়!
মতিন: আমরা যে ভাষা আন্দোলন শুরু করলামঃ ওদের দলীয় যারা, তারা চাচ্ছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে সরকারের আদেশ মেনে চলা। আমরা বললাম, সরকারের আদেশ মানার কোনো কারণ নাই। তারা অন্যায়ভাবে আদেশ জারি করেছে। আমরা এই আদেশ মানব না। আমাদের দাবি আমরা অ্যাসেম্বলি অভিমুখে যাব, জগন্নাথ হলের কাছে। সেইখানে আমাদের দাবি তুলব। তাদের বলব, তোমরা তো একটা প্রভিন্সিয়াল অ্যাসেম্বলি, তোমরা কী আইন পাস করবা। পাকিস্তানের মেম্বার হিসাবে তোমরা গণপরিষদের কাছে বলো, তোমরা আমাদের ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন কর। আমরা চাই, বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হোকÑ এই মর্মে তোমরা একটা প্রস্তাব পাস কর। তারপরে আমরা দেখব।
এই সব দাবি-দাওয়া নিয়ে অ্যাসেম্বলিতে যাওয়ার আগেই মেডিক্যালের কাছে গুলি চলল। ২১ ফেব্র“য়ারি। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হলো।
মামুন: বেশ কয়েক বছর আগে জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সরদার ফজলুল করিমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ভাষা শহীদ বরকত পুলিশের ইনফরমার ছিলেন’। আপনি শুনেছেন এটা?
মতিন: শুনেছি। আব্দুর রাজ্জাক সাহেব কী করেছেন? তিনি কোথা থেকে কেন এই ভিত্তিহীন মন্তব্য করেছিলেন জানি না। তবে স্ট্যান্টবাজি করাটা তাঁর চরিত্রে ছিল। আমাদের দুর্যোগ মুহূর্তগুলোতে তাঁকে কেউ পায়নি। তিনি সবসময় আড়ালে থেকেছেন। তাঁর মতো মানুষ জাতিকে কত কিছু দিতে পারত।
মামুন: তাঁকে নাকি একজন পুলিশ কর্মকর্তা এই তথ্য দিয়েছিলেন।
মতিন: একজন পুলিশ এরকম তথ্য দিলেই তিনি জাতির সামনে তা তুলে ধরবেন? বিচার বিশ্লেষণ না করেই! একটা নতুন দেশ, নতুন জাতির প্রতিষ্ঠার লগ্নে তাঁর মতো একজন বাঙালি মুসলমান দৃষ্টান্তপূর্ণ অবদান রেখে যেতে পারতেন। তিনি হুকো ফুঁক দিয়ে সারাজীবন পার করে গেলেন! বাস্তব কোনো কাজ করতে পারলেন না।
মামুন: কারা ভাষা সৈনিক?
মতিন: ১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন তারা সবাই যেমন মুক্তিযোদ্ধা, তেমনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় যারা সমর্থন দিয়েছিলেন তারা সকলে ভাষাসৈনিক! আর যদি বিশ্লেষক বা গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে উত্তর দিতে হয় তাহলে বলতেই হয়, ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যারা যুক্ত ছিলেন শুধু তারাই ভাষা-যোদ্ধা।
মামুন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ না স্বাধীনতা যুদ্ধ?
মতিন: অবশ্যই স্বাধীনতা যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ তো বিশাল ব্যাপার। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সকল সমস্যা ও শৃঙ্খল থেকে বাঙালি জাতি যেদিন মুক্ত হবে সেদিন বলতে পারেন আমরা মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছি।
মামুন: তাহলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলছে
মতিন: মুক্তিযুদ্ধ এখনও চলছে। সেদিনই সত্যিকার মুক্ত হব আমরা, যেদিন দরিদ্র মানুষদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারব। কৃষকদের জন্য আমরা কিছুই করতে পারিনি। তাহলে কিসের মুক্তিযুদ্ধ!মামুন: ১৯৫২ সালের ফেব্র“য়ারিতে পুলিশের গুলিতে যারা শহীদ হলেন তাদের কাউকে আপনি চিততেন?মতিন: পরিচয় ছিল না।মামুন: আপনি তো তখন ছাত্রদের নেতাঃমতিন: ভাষা শহীদদের কেউই ফোরফ্রন্টের লোক ছিলেন না। আপনি বদরুদ্দীন উমর সাহেবের বইটা পড়ে দেখবেন। ওতে সব লেখা আছে।মামুন: ঠিক আছেঃ আচ্ছা।
মতিন: তারপরে তো আমি জেলে গেলাম। আমাদের দশ জনের নামে ওয়ারেন্ট।
মামুন: আর নয়জন কারা ছিলেন?
মতিন: নয়জনের মধ্যে অলি আহাদ একজন। কাজী গোলাম মাহবুব এবং পরে মওলানা ভাসানী অ্যারেস্ট হলেন। তোয়াহা সাহেব ছিলেন। খন্দকার ইলিয়াস এরা কেউ ছিলেন না।
মামুন: কোথায় গেলেন গ্রেফতারের পর?
মতিন: আমাদের আটজনকে রিমান্ডে নেয়া হলো। কোথায় কীভাবে কী করেছি এরকম জেরা ও প্রশ্ন করল। আমাকে আর অলি আহাদকে একসাথে অনেক প্রশ্ন করা হলো।
মামুন: সেটা কোথায়, মিন্টু রোডে?
মতিন: না, ওই সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স অফিস। সদরঘাটের কাছে বুলবুল একাডেমির অফিসে। ওইখানে আমাদের তিনদিন রাখল। আমাকে ও অলি আহাদকে একসময় সেপারেট করল। আমি তখন পার্টি বিলং করি না। রাজনৈতিক কোনো বড় নেতাকে জানিও না। সত্যি কথা বললাম তাদের। আন্দোলন করছি তা জোড়ালোভাবে বললাম, ধরা যখন পড়েছি যা হয় হবে। পুলিশ আমার সব কথা বিশ্বাস করল না। তাদের সন্দেহÑ কমিউনিস্টদের নির্দেশে বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছি কি না।
মামুন: আপনি তো কমিউনিস্ট হতে চেয়েছিলেন?
মতিন: এখনও আছি। আমার তো মনে হয়, দে আর নট প্র্যাকটিক্যাল। দেশের অবস্থা মানুষ একরকম ভাবে, আর এরা আরেকরকম ভাবে। আর অন্যের ওপর নির্ভর করে। এই রাশিয়াতে কী হয়েছে, চীনে কী হয়েছে এটার ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করে।
নির্ভর তো করতে হবে দেশের জনগণের ওপর। তবুও কমিউনিস্টরা স্যাক্রিফাইসিং পিপল। এটা দেখতাম। জেলে থাকতে আমি বুঝলাম, কোনো পরিবর্তন আনতে গেলে এই সাধারণ মানুষই করবে। সুতরাং সাধারণ মানুষদের রাজনীতি করতে গেলে যে পার্টিÑ সেটা কোন পার্টি হতে পারে? তখন আমি সিদ্ধান্তে আসলাম মুসলিম লীগ বা আওয়ামী লীগ এই সমস্ত বড়লোকের পার্টিঃ এরা তো এই সমাজটাকেই বজায় রাখবে। এই করে ঊনপঞ্চাশ সনে আওয়ামী লীগ হয়েছে, এখনও তারা তাই করছে। আওয়ামী লীগের লোকেরা, মানে এক একজনের কী যে অবস্থা! ঢাকাতে এক একজনের চার-পাঁচতলা বাসা, আবদুস সামাদ আজাদÑওনারও পাঁচতলা বিল্ডিং। এইরকম বিল্ডিং নাই এমন কোনো আওয়ামী লীগ নেতা নাই। এই যে ফুলে-ফেপে উঠেছে তারা, আমাদের সেটায় আপত্তি নাই। হও তোমরা। কিন্তু দেশের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করবে, তাদের খাওয়া জুটবে না, তাদের কোনো শীতবস্ত্র নাই, এই যে বন্যা হয়ে গেল তাদের কোনো জমি নাই। তারপরে খাসজমিগুলো তারা দিয়ে দিচ্ছেÑসেই জমিঅলাদেরকেই। এই অবস্থায় মানুষের তো ভালো হয় না। যেরকম আওয়ামী লীগ, সেরকম বিএনপি, সেরকম জাতীয় পার্টি বা জামাতীরাÑতাহলে পাবলিক কোথায় যাবে? জনগণ শেষপর্যন্ত আন্দোলনেই যাবে।
আমি সবসময় সাধারণ মানুষদের পক্ষেই থেকেছি। কোনো চাকরি-বাকরিও করি নাই। আমার দুইটা মেয়ে, বিয়ে হয়ে গেছে। আমরা দুজনে এই বাড়িতে আছি। গত মাসে বহু কষ্টে এই বাড়ির ভাড়াটা দিয়েছি। আমি ভাবছিলাম আর বোধহয় বাড়িটায় থাকা যাবে না। একটা ছোট-মোটো ঘর ভাড়া করতে হবে। সেখানে দেড়-দুই হাজার টাকায় এক রুম পাওয়া যায়। জনকণ্ঠ পুরস্কারটা পেয়ে আপাতত বেঁচে গেছি। কোনোদিন কেউ আনুষ্ঠানিক সম্মান দেয়নি।
মামুন: রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি বলে ক্ষোভ আছে?
মতিন: না না, এরা কেন শত্র“কে পুরস্কার দেবে? এই রাষ্ট্রটা তো এদের। এরা যাদের স্বার্থের বিরোধী মনে করেÑতাদের এরা দিতে চায় নাকি! সেই জন্যই জনকণ্ঠের এটাকে খুব ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। আমার যদি কোনো স্থান থাকে এবং সমাজ তা না দেয়, আমি তো কিছু করতে পারি না।
মামুন: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে, এটা স্বাভাবিক মনে করেন?
মতিন: এটা খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রকৃত ইতিহাসকে ঘুরিয়ে-পেচিয়ে যে যার মতো করে নিচ্ছে, দেখছি। আমাদের ইতিহাস বিকৃতির একটা ধারা আদিকাল থেকে চালু আছে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এখনও অসুস্থ। এটাকে সেবা করা দরকার।
মামুন: বলছিলেন বদরুদ্দীন উমর সাহেবের বইটা পড়তে। নাকি অন্য কোনো ইঙ্গিত দিতে চাইছেন?
মতিন: তিনি অনেক খেটে কাজটি করেছেন। তার পরিশ্রমের তুলনা হয় না। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে জাতির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কোনো জায়গায় ফাঁক রয়ে গেছে। তিনি যদি সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে সামনের কাতারে যুক্ত থাকতেন তাহলে তাঁর বইগুলো আরও মূল্যবান হতো। তাঁর বাবা আবুল হাশিম সাহেব পণ্ডিত মানুষ ছিলেন, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
মামুন: ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস আপনারা লিখলেন না কেন?
মতিন: যারা ভাষা আন্দোলন করেছিলেন তারা কেউ কেউ তো লিখেছেন। কিন্তু নিজেকে সামলাতে পারেননি। আমি বলতে চাইছিলাম নির্মোহ থেকে ইতিহাস লেখাটা হয়নি। বদরুদ্দীন উমর সাহেব সেদিক থেকে মোটামুটি সফল হয়েছেন।
মামুন: রাজনীতিতে কীভাবে আসলেন এবং চূড়ায় উঠতে পারলেন না কেন?
মতিন: মন্ত্রী বা কোনো পদে ওঠার জন্য আমি রাজনীতিতে আসি নাই। কাজেই কোনো চূড়া স্পর্শ করার অভিপ্রায় ছিল না। ১৯৫৩ সালে চিন্তা করলাম, একটা সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করতে হবে। তখন থেকে আমি কমিউনিস্ট পার্টিভুক্ত আছি।
মামুন: সংগঠনটির নাম কি?
মতিন: পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি। চীন মস্কোপন্থিরা সব এক জায়গায় ছিলাম। মওলানা ভাসানী কমিউনিস্ট পার্টি করতেন না। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের। তবে মণি সিংহ, খোকা রায় এরা ছিলেন।
মামুন: পার্টির প্রধান কারা ছিলেন?
মতিন: কমরেড মণি সিংহ, খোকা রায় এরা। এরা ছিলেন বুর্জোয়ানির্ভর একটা বাম দল। ধনীকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি মানে গরিবের দল। দুস্থ লোকের পার্টি। সে হিসেবে তারা গরিবদের কথা বলবেঃ তা না করে ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ দেখত। বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করত তারা। এবং দেখেন, তা প্রমাণও হয়েছে। আজকে ৫০ বছরের মধ্যে তারা এক টুকরা ঘাসও তুলতে পারে নাই। গণমানুষের জন্য কোনো কাজ করতে পেরেছে এমন পরিচয় নাই। কিছুই করতে পারে নাই।
কেন পারে নাই? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিপ্লব করতে না পারলেওঃ নেপালে বিপ্লব করতে পারে নাই তো সো হোয়াট, সেখানে কমিউনিস্টরা একটা মর্যাদা নিয়ে আছে। আমাদের প্রতিবেশি পশ্চিম বাংলায়, তারাও তো বিপ্লব করতে পারে নাই, কিন্তু তারাও মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাশিয়াতে বিপ্লব করেছিল। বিপ্লব আবার ব্যর্থ হয়েছে বা সেখানে আজকে বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় এসেছে, তাতে কি হয়েছে! চীনে সফলও হতে পারে আবার নাও হতে পারে। কিন্তু সোভিয়েতে সমস্ত মানুষের একটা করে বাড়ি দিয়েছিল, এটা কি সোজা কথা! প্রত্যেকটা লোক শিক্ষিত হতে পেরেছিল। একটা নিরাপত্তা ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এরা সেই আদর্শ ত্যাগ করল, তারপরে আমলা হয়ে গেল। টাকা-পয়সা বাণিজ্য ব্যক্তিগত করতে গিয়ে এই যে এখনকার অবস্থা! এখন কোনো মান-সম্মান নাই, মর্যাদা নাই। তাদের কেউ মূল্য দেয় না।
তো পৃথিবীটা ক্রমেই সামনের দিকে যাচ্ছে। আপনে ভালো জানেন, আপনে একটা মডার্ন টেকনোলজির সাথে আছেন; দেখছেন তো পৃথিবীটা কোথায় যাচ্ছে! ক্রমেই উন্নতির দিকে যাচ্ছে। মানুষের ওপর অত্যাচার, মানবতার ওপর অত্যাচার এটা কমে আসছে।
মামুন: আপনি কোন আলামতে এই কথা বললেন?
মতিন: দেখছেন না মানুষ কত সচেতন হয়েছে! মানুষ এসব অত্যাচার বেশিদিন সহ্য করবে না। এবং সমস্ত মানুষের গণতন্ত্রের জয় হবে। এটা আমি বুঝতে পারছি অভিজ্ঞতা থেকে এবং এইটার জন্যই সংগ্রাম করছি। আমি সন্তুষ্ট যে আমার কর্তব্য পালন করেছি।
মামুন: ১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিতে আপনি সকল বামপন্থির সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু পরে লাইন পরিবর্তন করলেন কেন?
মতিন: এটা ১৯৬২ সালেঃ চীন ও রাশিয়ার মূল তফাৎটা ছিলÑ রাশিয়া মনে করেছে যে একটা বিপ্লব করতে হবে পরিবর্তনের জন্য। তারা করল ১৯১৭ সালে। তারপর থেকে সকলেই মনে করল রাশিয়ার পথেই বিপ্লব হবে। কিন্তু চীন যখন আসলোঃ তারা ১৯২২ সালে পার্টি করল। তারপর আস্তে আস্তে বড় পার্টি হয়ে গেল। চিয়াং কাইশেকের সঙ্গে তার মতবিরোধ ঘটল ১৯২৭ সালে এবং এরপরে এলাকা গঠন করে সংগঠিত হয়ে বাহিনী করল এবং চিয়াং কাইশেককে ফরমোজায় তাড়িয়ে দিল।
চীনের মাও সেতুং প্রথমেই বলেছিল, দেখ তোমাদের সমাজ আর আমাদের সমাজ এক নয়। তোমাদের সমাজ পুঁজিবাদী সমাজ হয়ে যাচ্ছে। আর আমাদেরটা এখনও সামন্তবাদী সমাজ রয়ে গেছে বা আধা সামন্তবাদী হতে পেরেছে। সুতরাং আমার দেশের মধ্যে সমাজতন্ত্র এখনই একধাপে করা যাবে না। আমার এখানে একটা পিপলস ডেমোক্রেসি, ডিকটেরশিপ অব দ্যা পিপল। এখানেই তফাৎ হল।
আমার তখন ওই চীনের পথটাকে সঠিক মনে হলো। তারপরে, যারা রাশিয়াঅলাদের পছন্দ করত, তারা রুশপন্থী হয়ে গেল। দুই ভাগ হয়ে গেল। তখন মণি সিংহ আমাদের বললেন, যেহেতু বনিবনা হচ্ছে না আপনারা চীনপন্থি কোনো পার্টি করতে পারেন। আমরা রুশ লাইনকে সঠিক মনে করছি, আমরা এই পার্টিতেই থাকতে চাই। থাকেন আপনারা। আপনাদের সাথে থাইকা আমাদের বিপ্লব হবে না। আমরা আলাদা হয়ে যাব।
মামুন: কমরেড মণি সিংহের দল আন্ডারগ্রাউন্ডে গেলেন কেন?
মতিন: তারা কেন যে আন্ডারগ্রাউন্ডে গেল তা তো বুঝি না। সরকার তো তাদেরকে বলে নাই। নিজে নিজে আন্ডারগ্রাউন্ডে গেল। পাকিস্তান হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে কতগুলো ভুল পলিসি-টলিসি নিল, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায় লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’Ñ এইসব স্লোগান ভারতীয় পার্টির মতো করে দেওয়াতে পাকিস্তান সরকার সুযোগ পেল, এদেরকে জেলে নিল। তখন পার্টি আন্ডারগ্রাউন্ডে গেল। আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকতে থাকতে মাটির ওপরে আর আসতে পারল না। এখন যদিওবা আসছে, মানুষ তাদের চেনেও না। তাদের কোনো স্বীকৃতি নাই। তারা কোনো বিপ্লবের পক্ষে কাজ করে নাই।
মামুন: এক সময় আপনারাও তো আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন?
মতিন: চীনপন্থিরা ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। পরে আমরা দেখলাম আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে কাজ করা যাবে না। তখন নির্বাচনের চেষ্টা করলাম। আমি দুইবার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওয়াকার্স পার্টি থেকে। শুধু আমারই জামানত বাজেয়াপ্ত হয় নাই। বার হাজার, আরেকবার সাড়ে বার হাজার ভোট পেয়েছিলাম। আমার তো টাকা-পয়সা নাই। খরচ না করতে পারলে এদেশে কেউ ভোট দেয় না।
মামুন: ১৯৭০ সালে আপনারা নির্বাচনের বিরোধিতা করেছিলেন যখন বাঙালি জাতি এর পক্ষে ছিল।
মতিন: সেই নির্বাচনে আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল হটকারী। জনগণ চাচ্ছে নির্বাচন কর, দেশ স্বাধীন কর। আমরা ঐটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম।
মামুন: আপনারা ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
মতিন: ভুল সিদ্ধান্ত মানে চিন্তা অনুযায়ী ভুল হয়তো। মুল্যায়নটা হবে বা হয় কিসের ওপরেঃ আমি হয় নিজের শক্তিকে বেশি করে বা কম করে দেখার ফলে হয়। যথাযথভাবে দেখলে পরে সিদ্ধান্ত সঠিক হয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে সঠিক কাজটি করেছিল।
মামুন: মুক্তিযুদ্ধে আপনাদের দল চীনের সিদ্ধান্তের কারণে বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে সমর্থন দিতে পারেনি, নিষ্ক্রিয় ছিল।
মতিন: স্বাধীনতার তিরিশ বছর পরেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এখনও চলছে। কে বলে আমরা মুক্ত হয়েছি? আপনি যে অভিযোগ করলেন ১৯৭১ সালে আমরা কিছু করিনি। আমাদের পার্টি খুবই সক্রিয় ছিল। আমরা আর্মির সাথে লড়াই করেছি। তোয়াহা সাহেব তার এলাকায় নোয়াখালীতে ফাইট করেছেন। কয়েক জায়গায় সম্মুখ যুদ্ধও করেছেন তিনি। কোনোদিন প্রকাশ্যে আহাজারি বা দাবি করেন নাই যে, তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। প্রকৃত দেশপ্রেমিকের মতো তিনি পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।
আমাদের এলাকায় উত্তরবঙ্গে আমরা ফাইট করেছি। ভারতে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। পাকবাহিনীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে যুদ্ধ করেছি। আওয়ামী লীগের বড় নেতারা আমাদের খবর জানতেন। তাজউদ্দীন আমাদের ত্যাগের কথা জানতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতাকে তাদের একমাত্র অর্জন করে অন্যদের করলেন উপেক্ষা। সব পদক খেতাব নিয়ে গেলেন তারা। যুদ্ধ তারা একাই করেছেন বোঝালেন শেখ সাহেবকেও। জাতীয় চিন্তার ফাটল তারাই ধরিয়েছেন। আমরা আওয়ামী লীগের অত্যাচারের বিরোধিতা করেছি। কোথাও আমাদের এতটুকুও জায়গা দেয়া হয় নাই। আমাদের অনেক নেতা-কর্মীকে নির্মমভাবে বিনা বিচারে তারা হত্যা করেছে। এখনও এই হীন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই দেশটা কি শুধুই আওয়ামী লীগের? মওলানা ভাসানীকে মুছে ফেলার চেষ্টাও ছিল। শেখ সাহেব জানতেন তিনি আসলে কার শিষ্য। সোহরাওয়ার্দী নয়, আসলে মওলানা ভাসানীই তার গুরু। মেহনতি মানুষের এমন বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এশিয়া আফ্রিকায় বিরল। ভাসানী ছাড়া বাঙালি মুসলমানদের বিকাশ হতো না।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন দেশ স্বাধীন হলো আমরা দেশের ভেতরেই ছিলাম। তারা সব ভারত থেকে এসে বড়াই করা শুরু করল। কিন্তু দেশের মধ্যে থেকে পাকবাহিনীর অস্ত্র ছিনিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যোদ্ধা আমরা। আমরা তো এখানে ছিলাম। আর্মিরা আমাদের মা-বোনদের অত্যাচার করেছে। গুলি করে মেরেছে। গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। এসবের মধ্যে আমরা যুদ্ধ করেছি। ভারতে আমাদের দু’চারজন কর্মী যখন ট্রেনিং ক্যাম্পে গেছে তাদেরকে ট্রেনিং না দিয়ে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা হয়েছে।
মামুন: মাওলানা ভাসানীও ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মতিন: মাওলানা ভাসানী তখন এখানে, তার বাড়িতে, বিন্নাপুরে আগুন লাগিয়ে দিল। তো মওলানা ভারতে গেলেন। তারও তো কিছু দ্বৈতচরিত্র ছিল। হি ওয়াজ প্যাট্রিয়ট নো ডাউট। লিডার হিসাবে ভাসানী বা মুজিবÑ কারোরই অ্যাডভান্স চিন্তা ছিল না। ভাসানীই হোক আর আওয়ামী লীগঃ আমরা কৌশল গ্রহণ করলাম ভারতে যাব না। আমরা এখনও মনে করি, ভারতে না গিয়ে আমরা কোনো ভুল করিনি।
মামুন: একাত্তর সালে চীন আমাদের স্বীকৃতি দিল না। কেন তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
মতিন: এটা তো ভুল বটেই। পরে তাদেরকে আমরা বলেছি কেন আপনারা এটা করেছিলেন। তারা বলেছে, দেখো আমরা যেটা মূল্যায়ন করেছি আমাদের মূল্যায়নটায় এখনও অটল আছি। তখন আমরা মনে করেছি পাকিস্তান রাষ্ট্র হয়েছে, পাশে বড় রাষ্ট্র ভারত। ভারত যাতে আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এই অঞ্চলে তা আমাদের দেখতে হয়েছে। এইটা তাদের নিজস্ব মূল্যায়ন।
মামুন: আপনারা কি রাজনৈতিক লাইনের কারণে পিকিং থেকে অর্থকড়ি পেতেন?
মতিন: আমরা পেতাম না। সবরকম প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে লড়াই করতে হয়েছে আমাদের। মস্কোপন্থিরা মাসে মাসে মাসোহারা পেতেনÑএই সোভিয়েত পতনের আগের দিন পর্যন্ত। বাংলাদেশে তারা ছিলেন মস্কোর বেতনভুক্ত রাজনেতিক কর্মচারী!
শেখ সাহেব জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। তাজউদ্দীনের সঙ্গে তাঁর কনফ্লিক্ট হয়েছিল। কারণ তাজউদ্দীন ইন্দিরা গান্ধীর খাস লোক হিসেবে গ্রো করেছিলেন। শেখ মুজিবের এত ভারত প্রীতি হওয়ার অভিলাষ ছিল না। তিনি মনে করতেন একটা স্বাধীন বাণিজ্য ও কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে হলে তার একটা স্বাধীন সেনাবাহিনী থাকা দরকার। কিন্তু তিনি রক্ষীবাহিনী করতে গেলেন। বড় একটা ভুল করলেন।
মামুন: আপনারা আত্রাইতে কী করতেন?
মতিন: আত্রাই ছিল আমাদের গোলা-বারুদের ঘাঁটি। সেখানে কাজ করতাম আমরা কৃষক দিনমজুরদের নিয়ে। আমাদের বহু দেশপ্রেমিক কর্মীকে মুজিব আমলে গোপনে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে আত্রাইতে আমাদের সাথে কয়েকবার সরকারী বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধ হয়। সম্ভবত জুন মাসে গুলিবিনিময়কালে যখন পিছু হটছিলাম আমরা, আমার ডান পায়ে রাইফেলের গুলি লাগে এবং নাটোরে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় হাতিয়ারসহ ধরা পরি আমি। আমার জেল হয়ে যায়। মুজিবের মৃত্যুর প্রায় ২ বছর পর ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাই।
মামুন: দুই বাংলা এক হতে পারে?
মতিন: আমরা তো বাংলা ভাগ করতে চাইনি। ওরাই তো চলে গেল। ঐযে বলল, বাংলায় যেসব জেলায় হিন্দু মেজরিটি সেইসব জেলা নিয়ে আমরা ইন্ডিয়াতে থাকব। তোমাদের সঙ্গে থাকব না। তারা চলে গেল। এখন তারা বুঝতেছে আমরা তো কেন্দ্রের পাত্তা পাচ্ছি না। এখন তারা চিন্তা করছে। যদি তারা চিন্তা করে মনে করে, ধর্ম যাই হোক, আমরা তো সবাই বাঙালি। একই ভাষা।
আমি ইন্ডিয়াতে গেলে পরে তো তাজ্জব হয়ে যাই, আমাদের মতই বাংলা বলছে। আমাদের কাছে শিখে তো তারা বাংলা বলছে না। তাদের এটা মজ্জাগত ভাষা। সেভাবে এক ভাষা এক জাতি ভেবে যদি জনগণ বলে বা চায় তাহলে এক হতে অসুবিধা থাকতে পারে না। বাঙালি জাতি যখনÑ তখন এক হওয়াই তো উচিৎ মনে করি।
মামুন: তখন ওরা ডোমিনেট করবে না?
মতিন: ডোমিনেট তো করবেই, যদি আমরা শিক্ষা ও রাজনীতিতে অ্যাডভান্স না থাকি। রাজনীতিতে তারা পশ্চাদপদ অবস্থানে।
মামুন: তাই কী!
মতিন: বটে। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা ভাষা আন্দোলন করেছি। তারা কি করতে পেরেছে?
মামুন: কিন্তু যখন এক হয়ে যাবেন, তখন কাজ করবে বুদ্ধিবৃত্তিটাঃ
মতিন: সেই জন্যই তো অমর্ত্য সেন বলছেন, হাড়-মাংস যারা চিবাইয়া খাইতেছেঃ এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। মূলকথা, এই পুরনো শোষণের ব্যবস্থাধীন যেসব রাষ্ট্রÑ সে রাষ্ট্রব্যবস্থা আর চলবে না। এ-ধরনের রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে তো চলবে না। জনগণকে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে, চাকরি দিতে হবে, খাবার দিতে হবে। মর্যাদা দিতে হবে। আমি মনে করি বাঙালিদের এক হওয়া দরকার।
মামুন: আপনি নিজে একাত্তর সালে গুলি চালিয়েছেন, কোথায়?
মতিন: হ্যাঁ। সেটা আরিচা নগরবাড়ী, এখানে ফাইট হয়েছিল। রাতে হয়েছে, দিনে হয়েছে। একাত্তরের এপ্রিল মাসে নগরবাড়ীর ঐপারে যমুনা নদীর তীরে ওখানে হঠাৎ করে শুনলাম পাক আর্মির লোকেরা একটা ক্যাম্প করেছে ডাব বাগানে। ওখানে অনেক নারিকেল গাছ-টাছ ছিল। ওখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে নগরবাড়ী আর্মিদের বড় ক্যাম্প। তাদের কাছে ইনফরমেশন আসছেÑএই নদী দিয়ে বাঙালি সৈনিকদের একটি দল ভারতে যাবে। তখন ওরা এটাকে আটকাবে। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখলাম, এটা তো পাকবাহিনী না, আমাদের বাহিনী। যেই আমরা নদীর কাছে ওদেরকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেছি এই সময় পাকবাহিনী অ্যাটাক করল ওদের। ওই ডাব বাগানে। ওরা চারজন মারা গেল এবং পাক আর্মিরা পালিয়ে গেল। ভারতে যাওয়ার জন্য তারা ছিল মোট বাইশজন। যাওয়ার পথে এমন একটা ঘটনায় বেশ ধাক্কা খেলেন তারা। ওরা আমাদের পাঁচটা রাইফেল গুলিসহ দিলেন।
যারা মারা গেলেন তাদের পকেট থেকে আইডি কার্ড পাওয়া গেল। সেখান থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করে স্বজনদের বরিশাল ও খুলনায় চিঠি দিয়ে জানালাম আপনাদের অমুক লোক যুদ্ধে মারা গেছেন। তাকে আমরা সাধ্যমত দাফন করেছি। কোনো সময় যদি সুযোগ হয় এখানে এসে দেখে যেতে পারেন। তাঁদের সম্মানজনক মৃত্যু হয়েছে। আমরা তাঁদের অভিনন্দন জানাই। আপনারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বটে। কিন্তু দেশের জন্য তারা অবদান রেখে গেলেন। এইভাবে চিঠি পাঠিয়ে দিলাম।
আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে, আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার ভাই যমুনার কাছে একটা বাড়িতে রাইফেলের নল পরিষ্কার করছিল। এরমধ্যে নগরবাড়ী থেকে খবর পেয়ে পাকবাহিনী এসে আক্রমণ করল। তাকে আর্মসসহ ধরল এবং অনেক অত্যাচার করে হত্যা করেছে। তার ডাকনাম ছিল মনু। শাজাদপুরের গ্রাম থেকে আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। তখন তার বয়স প্রায় পঁচাত্তর। তাকে মারে রাজাকার-আলবদররা। যুদ্ধ করে পাক আর্মি মেরে তাদের হাতিয়ার ছিনতাই করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। কোনো এক জায়গায় দুই রাত থাকতে পারি নাই। জায়গা বদল করতে হয়েছে। পাক আর্মি সবসময় আমাদের ভয়ে তটস্থ থাকত।
মামুন: আপনি এখন কী করেন?
মতিন: কৃষক সংগঠন, কৃষক সমিতি করি। আর কিছু লেখার চেষ্টা করছি। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এসেছি। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ লিখেছি। অনেক তথ্য ভুলে যাই। এটার জন্য প্রচুর গবেষণার দরকার। বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে অনেক সময় পার করতে হয়েছে। আমার জীবনটা অত সহজ ছিল না। জীবনের প্রত্যেক বাঁকে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে।
মামুন: হক-তোয়াহা-মতিন-আলাউদ্দীন গলাকাটা রাজনীতি করেন, আপনাদের সম্পর্কে এটা কেন বলা হয়?
মতিন: এটা হল কমরেড চারু মজুমদারের লাইন, খতম করা। গণশত্র“ খতম কর। আমি মনে করি ওটা ছিল ভুল লাইন। আমি ওটা সাপোর্ট করি নাই। কিন্তু পার্টি করেছিল। এই সিদ্ধান্তটা সত্তরের দিকে আরম্ভ হয়েছিল পূর্ববাংলায়। হটকারী কোনো পলিসি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কৃষক ছাড়া এখানে কিছু করা যাবে না। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে হলে আগে কৃষকদের সংগঠিত করতে হবে।
মামুন: আপনি মনে করেন বিপ্লব হবে এদেশে?
মতিন: নিশ্চয়ই। হতেই হবে। এত ব্যবধান! এত অত্যাচার, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন আসতেই হবে।
মামুন: আপনারা বিপ্লব করতে পারলেন না কেন?
মতিন: আমরা হয়তো অযোগ্য! আমরা ভাষা আন্দোলন করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি আমরা সকলে। এখন আপনারা বিপ্লব করবেন। তরুণরা কোথায়? কেন তারা কৃষকদের কাছে যেতে পারছে না আপনার কাছে আমার প্রশ্ন।
মামুন: অনেক সময় নিলাম। আরেকদিন এসে কথা বলে যাব।
মতিন: আসবেন, আসবেন। যদি বেঁচে থাকি।
সূত্র: নতুনধারা, ফেব্রুয়ারী ২০১০

Related posts:

  1. হাজার হাজার বিনোদনের মাঝে মানুষ যে খুব কষ্ট করে কবিতার বইয়ে মগ্ন থাকবে তা কিন্তু আমার মনে হয় না: শহীদ কাদরী

এই বইয়ের খবর আপনার কোনো বন্ধুকে জানাতে চান? যদি তাই হয়, তাহলে নীচের প্রচ্ছদের ছবিটি রেডিও বাটন ক্লিক করে নিশ্চিত করুন:

আপনি যা লিখতে চান