হাজার হাজার বিনোদনের মাঝে মানুষ যে খুব কষ্ট করে কবিতার বইয়ে মগ্ন থাকবে তা কিন্তু আমার মনে হয় না: শহীদ কাদরী

লিখেছেন:

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: আদনান সৈয়দ

পঞ্চাশ-উত্তর বাংলা কাব্যের আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে কজন কবি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, কবি শহীদ কাদরী ছিলেন তাঁদের মাঝে অন্যতম। বিশ্ব-নাগরিকতাবোধ, আধুনিক মনন, ঝলমলে শহুরে জীবনের সুখ-দুঃখ, স্বাদেশিকতা আর দেশপ্রেমে ঠাসা শহীদ কাদরীর কবিতা। তিনটি কাব্যগ্রন্থ, ‘উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ এবং ‘কোথাও কোন ক্রন্দন নেই’। এই তিনটি কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই কবি শহীদ কাদরী আবহমান বাংলা কবিতায় এক বিশেষ জায়গা করে নেন। কবির চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘আমার চুম্বনগুলো পৌছে দাও’ বেরিয়েছে এই ফেব্রুয়ারীর বইমেলায়। ’৭৮-এর পর থেকেই কবি দেশের বাইরে। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে পাকাপাকিভাবে বসবাস করছেন। দুটো কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ায় সপ্তাহের তিন দিন তাঁকে ডায়লিসিস করতে হয়। শারিরিকভাবে অসুস্থ হলেও কবি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন নিয়মিতভাবেই। তাঁর নিউইয়র্ক, জ্যামাইকার ১১ এফ সুউচ্চ এপার্টমেন্টে আমরা যখন যাই তখন সন্ধ্যার নরম বাতি সবে মাত্র জ্বলতে শুরু করেছে। কবিপতœী নীরা কাদরীর উষ্ণ আতিথিয়তা সহযোগে আমাদের কথপোকথন শুরু হয়।

আদনান সৈয়দ : কবিতার ধর্ম কী?

শহীদ কাদরী : কবিতার কোন বর্ণবাদ নেই। কবিতার ধার্মিকতা হল আধ্যাত্মিকতা। ব্যক্তি আত্মার সাথে পরম আত্মার বিরহ মিল হল কবিতার ধর্ম।

আদনান সৈয়দ : আপনি এক পর্যায়ে কবিতা লেখা বন্ধ করে দিলেন। বললেন যে আমার যা বলার যা লেখার লিখে ফিলেছি। আপনার কী মনে হয় একজন লেখকের লেখালেখির জগৎ থেকে এরকম স্বেচ্ছানির্বাসন নেওয়া উচিৎ?

শহীদ কাদরী : হ্যাঁ, তা আমি মনে করি। আমি শামসুর রাহমানকেও বলেছিলাম কবিতার মান পড়ে যাওয়ার আগেই কবিতা লেখা বন্ধ করে দিতে। অবশ্য তিনি আমার কথার সাথে কোনভাবেই একমত হন নি। বরং এ নিয়ে তিনি আমার উপর একটু অভিমানও করেছিলেন। সমর সেন বলেছিলেন আমার যা বলার তা বলা হয়ে গেছে। তিনি আর লিখেন নি।

আদনান সৈয়দ : একজন লেখকের পড়াশুনার ব্যাপ্তি শুধু বিষয়কেন্দ্রীক হবে এটা কি আপনি বিশ্বাস করেন?

শহীদ কাদরী : মোটেও না। প্রচুর পড়াশুনা করতে হবে। একজন লেখক তার পড়াশুনার গণ্ডি কোনভাবেই সীমিত করে রাখতে পারেন না। আইনস্টাইন যেমন পড়তে হবে পাশাপাশি ফ্রয়েড, কার্ল মার্কস,জেমস জয়েস, প্র“স্ত পড়তে হবে। এগুলো না পড়লে বোঝা যায় না যে মানুষের মেধা কতদূর এগুতে পারে। অর্থাৎ মুল কথা হল জ্ঞানের কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নাই। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন যা কিছু পড়ার মত তা আমি সবই পড়েছি। বুদ্ধদেব বসু প্রতিদিন ৭/৮ ঘন্টা নিয়মিতভাবে পড়াশুনা করতেন। শামসুর রাহমানকে দেখেছি তিনি দুই তিন দিন কবিতা না লিখতে পারলে অস্থির হয়ে যেতেন।

আদনান সৈয়দ : তারকোভস্কির একটা বিখ্যাত উক্তি আছে। তিনি বলেছিলেন যে সত্যকে কখনো সত্যের মধ্যে পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় সত্য অর্জনের পথে। সত্যান্বেষার পথটাই যথার্থ সত্য। কিন্তু সত্য কি? আমরা সত্য কাকে বলব? মিথ্যাই বা কি? শব্দগুলো কি খুবই আপেক্ষিক নয়?

শহীদ কাদরী : সত্য আর মিথ্যার আবর্তন নিয়েই আমাদের জীবন। সত্যকে আবিস্কার করা বা অজর্ন করার জন্য প্রয়োজন একধরনের সাধনা, ত্যাগ। এই ত্যাগই অনেক সময় আমাদেরকে সত্যের কাছাকাছি পৌছে দেয়।

আদনান সৈয়দ : জাগতিক সৌন্দর্যের মধ্যে মানব সমাজের স্থানতো আছেই।
কবিগুরু বলেছেন,
বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ
কেমনে দিই ফাঁকি
আধেক ধরা পড়েছি গো
আধেক আছে বাকি। (কল্পনা)

ফাঁদ কি সত্যি পাতা আছে? আমরা কি নিত্য সেই ফাঁদে ধরা পড়ছি না? জাগতিক সৌন্দর্য চেতনা কি হারাচ্ছি না?

শহীদ কাদরী : জাগতিক সৌন্দর্য আবার কি? আমাদের রোমান্টিকতার চাদরে মোড়া জীবনের ভেতরেই আছে আরেক কুৎসিত চেহারা। বদলেয়ার সে কারণেই গাছের সাথে বাতাসের ঘর্ষণের যে শব্দ হয় সেই শব্দের মাঝে তিনি কফিনে পেরেক ঠোকার শব্দ শুনতে পেতেন। জাগতিক সৌন্দর্য একটা বোধ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আদনান সৈয়দ : জার্মান দার্শনিক য়োহান্ গেয়র্গ হামান্ বলেছিলেন যে, ‘কবিতাই মানবজাতির মাতৃভাষা’। আপনিও কি তাই মনে করেন?

শহীদ কাদরী : তাহলেতো খুবই ভালো হত!!(হেসে হেসে)

আদনান সৈয়দ : আপনার প্রিয় কবিতাগুলোর নাম করবেন কি?

শহীদ কাদরী : বৃষ্টি বৃষ্টি, উত্তরাধিকার, কিছুই কিনবো না, অগ্রজের উত্তর ।

আদনান সৈয়দ : একজন বড় লেখক হতে হলে সবচেয়ে বেশি কি প্রয়োজন?

শহীদ কাদরী : প্রচুর পরিশ্রম। প্রচুর পড়াশোনা আর পাশাপাশি জীবনকে দেখতে হবে বিভিন্ন আঙ্গিকে। লেখক হওয়া একটা সাধনার ব্যাপার।

আদনান সৈয়দ : চলচ্চিত্র আর সাহিত্যের মধ্যকার সম্পর্কটাকে আপনি কি চোখে দেখেন? এই যে আমরা বলি ‘চলচ্চিত্রায়ন’ আসলে ব্যাপারটা বলতে কী বোঝায়? বলতে চাই এই পদক্ষেপ কি নতুন এক শিল্পিত রূপ সৃষ্টির লক্ষ্যে সাহিত্যের ভুমিকাকে আরো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করবে?

শহীদ কাদরী : চলচ্চিত্রায়নে সাহিত্যের পাশাপাশি এর অন্যান্য কলাকুশলিদের একটা বড় ভুমিকা আছে। যে কোন বড় মহৎ সাহিত্য নিয়ে যদি চলচ্চিত্র হয় তাহলে তা আউটস্ট্যান্ডিং হতে বাধ্য। চলচ্চিত্র যেহেতু বিভিন্ন শিল্পের এক শিল্পিত সমাহার সেক্ষেত্রে সাহিত্যের প্রতিটা চরিত্র, কাহিনী, সুর, রং, এবং সবচেয়ে বড় কথা প্রেক্ষাপটটা তৈরি হয় যথাযথ চলচ্চিত্রায়নের মাধ্যমেই।

আদনান সৈয়দ: “এই স্যাঁতসেতে ঠাণ্ডা উপাসনালয়ে পেতে দাও
জায়নামায, শুকনো কাঁথা,খাট, স্তুপ স্তুপ, রেশমের স্বাদ।”(আলোকিত গণিকাবৃন্দ)
অথবা
“অথচ এ-শীতে একা, উদ্ধত আমি,
আমি শুধু পোহাই না ম্লান রোদ
প্রতিবেশী পুরুষ নারী আর বিশাল
যে রিক্তগাছ, সে ঈর্ষায় সুখী
নিয়ত উত্তাপ দিই বন্ধু পরিজনে।”(এই শীতে)

আপনার প্রায় প্রতিটি কবিতায় ঠিক এ ধরনের একটা বার্তা ঘুরে ফিরে আসে। কবিতার মাধ্যমে আপনি কী বলতে চান?

শহীদ কাদরী: আমার চেতনায় আর বিশ্বাসে মানুষের সাম্যবাদী বিশ্বাসকে সবসময় লালন করেছি। যে কথাটা আমাদের রাজনীতিবিদরা তাদের বক্তৃতায় অথবা লেখার মাধ্যমে বলতে চান আমি সে কথাটাই আমার কবিতার ভাষায় বলতে চেয়েছি। মানবতাই হল সবচেয়ে বড় দর্শন।

আদনান সৈয়দ: যতদুর জানি আপনি প্রথম দিকে মঙ্গলাচরণ অথবা সুকান্তর ভাব-দর্শনে বিশ্বাসি ছিলেন। আপনার কবিতায় তাদের প্রচ্ছন্ন কোন ছাপ পড়েছে কি?

শহীদ কাদরী: না ঠিক তা নয়। আমি সমর সেনের খুব ভক্ত। তবে সুকান্তর প্রতি দুর্বলতা আমার সবসময় ছিল। কিন্তু এদের ভাব বা দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমি কখনো কবিতা লিখিনি।

আদনান সৈয়দ: আধুনিক কবিতা বলতে আপনি কি বুঝেন?

শহীদ কাদরী: সাইন্টিফিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব দি ইউনিভার্স – হল আধুনিক কবিতার মূল কথা। কবিতায় আধুনিক মনন আর চিন্তার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তিকে স্থান দেওয়া। কবিতা দুরকমের হয়। ১) স্মৃতির উপর নির্ভর করে আর ২) বিশ্ববোধ, দর্শনকে আত্বস্থ করে। তবে কবিতা যখন সময়কে ধরে রাখে, চলমান তথ্য, উপাত্তকে নিয়ে ছুটে চলে তখন সেই কবিতাকে আমরা আধুনিক কবিতা বলতে পারি। যেমন সুধীন দত্ত দার্শনিক চিন্তাকে তাঁর কবিতায় উপস্থাপন করে এক অসাধ্য সাধন করেছেন, কবিতাকে অনেক আধুনিক করেছেন।

আদনান সৈয়দ : যতদুর জানি কবিতার বইতো বটেই নতুন যে কোন বইপত্রের খোঁজ পেলে তা পাওয়ার জন্য আপনি ব্যস্ত হয়ে যেতেন। বই সংগ্রহ করার এত উৎস কোথায় পেতেন?

শহীদ কাদরী: আমরা বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকা কবে বের হবে সে দিকে হা করে চেয়ে থাকতাম। কারণ বুদ্ধদেব বসুর পত্রিকায় কবিতার পাশাপাশি অনেক ধ্র“পদী সাহিত্যের উপর আলোচনা থাকত যা ছিল আমাদের মত সাহিত্যমোদিদের জন্য এক লোভনীয় উপাদান। তাছাড়া বই পাওয়ার অন্যান্য উৎসগুলো ছিল বন্ধুবান্ধব-আত্বিয়স্বজনদের সাথে ব্যাক্তিগত যোগাযোগ, বন্ধুদের কাছ থেকে মেরে দেওয়া, ধার করে কারো কাছ থেকে পাওয়া আর বাংলাবাজার তো ছিলই। যেমন আমি বিউটি বোর্ডিংয়ে খালেদ চৌধুরীর সাথে আড্ডা দিতাম, এর পেছনে আরেকটা কারণ ওনার বাসায় ছিল বিস্তর বইপত্র। খালেদ ছিল আমার দেখা সেই সময়ে সবচেয়ে স্কলার একজন লোক। অসম্ভব পড়–য়া আর বিদ্বান বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন ঠিক তাই। সেই সময়ে মার্কসের ডাস ক্যাপিটাল বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন।

আদনান সৈয়দ: খালেদ চৌধুরী সম্পর্কে আরো কিছু বলেন।

শহীদ কাদরী: অসাধারন জ্ঞানী এক জন লোক। খালেদ চৌধুরী, সুকুমার মজুমদার এদের সংস্পর্শে এসেই আমার মনে হল কবিতা লিখে কি হবে? তখন আমরা ভাবতে শুরু করি যে কবিতা লেখা একটা তুচ্ছ ব্যাপার। বস্তুনিষ্ঠ জীবনের সন্ধান করতে হলে বিজ্ঞান আর দর্শনের দ্বারস্থ হতে হবে। রোমান্টিকতার আর কাব্যের হাহাকার জীবন হতে পারে না। খালেদ চৌধুরী আমার চেতনার মুলে এরকমই একটা বিশ্বাস গড়ে দিয়েছিলেন। দুঃখজনক যে খালেদ চৌধুরীর মত এত বড় মাপের ব্যক্তিদের খোঁজ-খবর আর আমরা কেউ রাখি না। আর তিনি লেখালেখির জগৎ থেকে নিজেকেও অনেক গুটিয়ে নিলেন। অথচ লিখলে তিনি নিঃসন্দেহে একজন বড় মাপের লেখক হতে পারতেন।

আদনান সৈয়দ: কবিতা লিখে কি হবে- এই বিশ্বাসে বদ্ধমুল হয়ে দীর্ঘদিন আপনি কবিতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন?

শহীদ কাদরীঃ হ্যা, ৫৭ থেকে ৬৩ পর্যন্ত কবিতার পথ দিয়ে হাঁটিনি।

আদনান সৈয়দ: তাহলে আবার কবিতার পথে কিভাবে ফিরে আসলেন?

শহীদ কাদরীঃ ষাটের দশকে ঢাকার কেসভা রেস্তোরায় সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যে’-এর প্রকাশনা উৎসব চলছে। কাব্যগ্রন্থটি সৈয়দ হক উৎসর্গ করেছিলেন কবি শামসুর রাহমানকে । সেই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমান আমাকে বললেন যে, “ আপনি যে রাস্তার কথা ভাবছেন সেটা আপনার নয়। কবিতার পথই হল আপনার একমাত্র পথ।” সেদিন থেকেই ভাবতে থাকি যে কবিতায় আবার ফিরে আসবো। আর তারই ফসল আমার ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ কবিতা। কবিবন্ধুৃ আল মাহমুদ কবিতাটি দেখেই লুফে নিলেন আর সমকালে ছেপে দিলেন।

আদনান সৈয়দ: তাহলে বলা যায় আল মাহমুদ আর শামসুর রাহমানের হাত ধরেই আপনি আবার কবিতার জগতে চলে এলেন।

শহীদ কাদরী: ঠিক তাই। আমি শুধু কবিতায় ফিরে আসিনি, আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হত না যদি না আমার এই দুই কবিবন্ধু তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিতেন। আল মাহমুদ তখন বইঘরে চাকরী করতেন। তাঁর বিপুল উৎসাহেই বইঘর থেকে আমার প্রথম কাব্য গ্রন্থ ’ উত্তরাধিকার’ প্রকশিত হয়। উল্লেখ্য, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান আর আমার একই মোড়কে চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেটা ১৯৬৭ সালের কথা।

আদনান সৈয়দ: দীর্ঘদিন পর আপনি যখন ’বৃষ্টি বৃষ্টি’ কবিতাটি লিখেছিলেন তখন কিন্তু কবিতাটি নিয়ে বেশ সাড়া পড়েছিল। আপনার এ বিষয়ে অভিমত কি?

শহীদ কাদরী: আমি সবসময় বলি যে ‘বৃৃষ্টি বৃষ্টি’ হল আমার ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’। কবিতাটা যখন লিখি সেদিনও বৃষ্টির দিন ছিল। তবে এর এলিনিয়েশন তৈরি করতে এত কাজ যে হয়ে গেছে তা কবিতাটা লেখার সময় টের পাই নি। যারা অত্যাচারি তারা সবসময় ভীত, আর বৃষ্টির জলে ধুয়ে মুছে দিচ্ছে আমাদের সমস্ত পাপচিহ্ন। সে কারণেই আমি নূহের সেই প্লাবনকে কবিতায় এলিনিয়েশন হিশেবে ব্যবহার করেছি। এলিয়ট যে অর্থে মরুভূমিকে তার ওয়েস্ট ল্যান্ড-এ নিয়ে এসেছিলেন।
আদনান সৈয়দ: আমাদের চৈতন্যপ্রবাহে তুমি ট্রাফিক আইল্যান্ড/ হে রবীন্দ্রনাথ(রবীন্দ্রনাথ)- রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আগেও এবং এখনও অনেককেই বিরুপ সমালোচনা করতে দেখি। ইদানিং বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের কিছু লেখক-সাহিত্যিকরাও সেই একই সুরের প্রতিধ্বনি করতে ব্যতিব্যাস্ত। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

শহীদ কাদরী : রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কথা চিন্তাই করা যায় না। আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলায় রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল। তা না হলে আমাদের বাংলা সাহিত্য আধুনিক আন্তর্জাতিক মানে পৌছতে হয়তো আরো একশো বছর অপেক্ষা করতে হত। শুধু সাহিত্যে নয় আমাদের আধুনিক চিন্তাধারা এবং মননে রবীন্দ্রনাথের ভুমিকা অতুলনীয়। নির্দ্বিধায় তিনি আমাদের চৈতন্যপ্রবাহে এক ট্রাফিক আইল্যান্ড।

আদনান সৈয়দ: “না,না, তার কথা আর নয়, সেই
বেরিয়েছে সকাল বেলায় সে তো- শহীদ কাদরী বাড়ি নেই” (অগ্রজের উত্তর)
শহীদ কাদরীর মত বহেমিয়ান আড্ডাবাজ কবিরা কি বাড়িতে থাকতে পারেন? নরম তুল তুলে শয্যাকে অবজ্ঞা করে যারা রেক্সে, বিউটি বোর্ডিংএ অথবা স্রেফ পার্কে বসে রাতের পর রাত আড্ডায় বুদ হয়ে থাকতেন তাদের জীবন যে অতৃপ্তের নেশায় ডুবে আছে তাতো বেশ বোঝাই যায়। কথা হল কী সেই পলায়ন, আত্মনিমজ্জন যা একজন কবিকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়?

শহীদ কাদরী: একজন কবির জীবন অন্যান্য সাধারণ মানুষের জীবন থেকে একটু আলাদা। তারা একটা অতৃপ্তি নিয়ে সবসময় ঘুরে বেড়ান। জীবনকে আরো কাছ থেকে বুঝতে চান, জানতে চান। আমরা নিজেদেরকে কতটুকু জানি বা বুঝি? এই পলায়নই হল একজন কবির মুক্তি, তার ঠিকানা।

আদনান সৈয়দ: আপনার কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে যুদ্ধবিরোধী, সাম্যবাদ, অথবা মানবতার একটা সুর কোথাও না কোথাও বেজে ওঠে।

শহীদ কাদরী: আমার দার্শনিক জগৎটাই তাই। আমার দার্শনিক বিশ্বাস আমার কবিতায় ঘুরে ফিরে চলে এসেছে বারবার। তাছাড়া আমার ছেলেবেলা কলকাতায় আমি বেড়ে উঠেছিলাম যুদ্ধ, মানুষের সাথে মানুষের অসমতা, হিংস্রতা এই বিষয়গুলোকে খুব কাছ থেকে আত্বস্থ করে।

আদনান সৈয়দঃ কবি শামসুর রাহমানের কবিতাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শহীদ কাদরী: সন্দেহ নেই কবি শামসুর রাহমন একজন অনেক বড় মাপের কবি। তার কবিতায় নারী, নিসর্গ প্রেমের পাশাপাশি তিনি আমাদের মনোজগৎ এবং পারিপার্শিক জগৎকেও ছুঁয়ে যেতে পেড়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা কবিতার সীমানাকে তিনি অনেক দুর পর্যšত বিস্তৃত করেছেন। আমি মনে করি কবি শামসুর রাহমান ছিলেন দুই বাংলার ভেতরই একজন প্রধান কবি।

আদনান সৈয়দ: আপনার কি মনে হয় যে সাহিত্যের সমালোচনা সবাই হজম করতে পারে?

শহীদ কাদরী : এটা খুবই একটা সত্যি কথা। আসলে সত্যিকার অর্থে সাহিত্যের সমালোচনা কেউ সহ্য করতে পারে না। মনে আছে বটুকে (প্রয়াত সাহিত্যিক মাহমুদুল হক) যখন বললাম যে লেখায় কোন অহেতুক কোন চর্বি আনবি না, অতিরিক্ত কোন ঘটনার বর্ণনা দিবি না। বটু আমার সে কথায় কোন রকম রাগ না হয়ে তা সে নিজের লেখায় কাজে লাগিয়েছে। শামসুর রাহমান আমাদের সব কবিদের নেতা ছিলেন। আমাদের কবিতা সম্মন্ধে অনেক উপদেশ দিতেন। আমরাও তার উপদেশ কখনো শুনতাম কখনো শুনতাম না। সবচেয়ে বড় কথা তার কাছে আমাদের প্রত্যাশার মাত্রাটা ছিল অনেক। কিন্তু তিনি সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না। তবে সাহিত্যের যথাযথ সমালোচনা মানেই হল লেখককে সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করা। আমরা সে কাজটি অনেক সময়ই ঠিক ভাবে করতে পারি না।

আদনান সৈয়দ : কবিতা অনেক ক্ষেত্রেই কল্পনানির্ভর আর বিজ্ঞান চলে যুক্তির উপর ভর করে। তাহলে কি বলবো কবিতার সাথে বিজ্ঞানের একটা চিরায়ত দ্বন্দ্ব লেগেই আছে?

শহীদ কাদরী: একসময় কবিতার লিখিত কোন আকার ছিল না। মানুষের মুখে মুখে কবিতা চর্চা হত। পরে মুদ্রণযন্ত্র এল। ইউরোপীয় রেনেসাঁর কবিতার উপর প্রভাব বিস্তার করলো। এদিকে বিজ্ঞান মোটামুটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও টেকনোলজি বিজ্ঞানকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে মানুষ মধ্যযুগীয় ঈশ্বর চিন্তা থেকে বিজ্ঞানমনস্ক হল। তা হলে দেখা যাচ্ছে কবিতা আর বিজ্ঞান পাশাপাশিই সহঅবস্থানেই চলছে। দ্বন্দ্ব থাকবে কেন?

আদনন সৈয়দ: আপনার কি মনে হয় কবিতার পাঠক এখন আগের চেয়ে কমে গেছে?

শহীদ কাদরীঃ একসময়ে পেশোয়ারে একটা বাজার ছিল নাম কিচ্ছাখানি বাজার। পাগড়ী পরা পাঠানরা চা নিয়ে জমিয়ে আড্ডা দিত এই কিচ্ছাখানি বাজারে। তাদের ঝুলিতে জমিয়ে রাখা যতরকম কিচ্ছা কাহিনী থাকতো তার সবই একজন আরেকজন কে শুনাতো আর রাতভর আসর কিচ্ছার আসর জমাতো। এটা ছিল এক ধরনের বিনোদন। এখন ফুটবল খেলা যেমন বিনোদন, কবিতার বই পড়াও তেমন একটা বিনোদন। এত হাজার হাজার বিনোদনের মাঝে মানুষ যে খুব কষ্ট করে কবিতার বইয়ে মগ্ন থাকবে তা কিন্তু আমার মনে হয় না।

আদনান সৈয়দ: যদি কবি না হতেন তাহলে কী ধরনের পেশা বেছে নিতেন আপনি?

শহীদ কাদরী: স্রেফ বাউন্ডেলে হতাম। রাস্তা ঘাটে আড্ডা দিতাম আর দাউ দাউ করে ঘুড়ে বেড়াতাম।

আদনান সৈয়দ: আপনি নাকি আড্ডা দিতে যেয়ে বাড়ি থেকে প্রায়ই উধাও হয়ে যেতেন?

শহীদ কাদরীঃ একবার সাতদিন আড্ডা দিতে যেয়ে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার বন্ধু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ঢাকা কলেজে সদ্য জয়েন করেছেন। আবার ব্যাচেলর। তার বাসায় দিনের পর দিন আমাদের আড্ডা জমত। আড্ডা বসতো বিউটি বোর্ডিং, রেক্সে। কখনো কখনো রেষ্টুরেন্টে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি। একসময় গভীর রাতে রেষ্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যেত তখন আমরা রাস্তায় হাটতাম আর আড্ডা দিতাম।

আদনান সৈয়দ: আড্ডার বিষয় কী ছিল?

শহীদ কাদরী: অবশ্যই লিটারেরী আড্ডা হত। তবে সাহিত্য ছাড়াও অনেক বিষয় নিয়েও আড্ডা চলতো।

আদনান সৈয়দ: আপনাদের আড্ডায় যাঁরা থাকতেন..

শহীদ কাদরী: সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দিন, শামসুর রাহমান, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সিকদার আমিনুল হক, মাহমুদুল হক কখনো কখনো আল মাহমুদ এরা সবাই থাকতেন আড্ডায়। শেষের দিকে আব্দুল মান্নান সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদসহ অনেকেই আমাদের আড্ডায় আসতেন।

আদনান সৈয়দ: একজন সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে একজন লেখক, শিল্পী বা সাহিত্যিকের জীবনের পার্থক্যটা কোথায়?

শহীদ কাদরী: আমি আগেও বলেছি যে শিল্পী-সাহিত্যিকদের রক্তে একটা অস্থিরতা সবসময় থাকে। এঁরা সবসময় একটা অস্থিরতাকে কাঁধে নিয়ে ঘুড়ে বেড়ান। এঁদের জীবন সাধারণ মানুষের জীবনের থেকে একটু আলাদা হয়। একটা অতৃপ্তি নিয়ে তাদের ঁেবচে থাকতে হয়।

আদনান সৈয়দ: অতৃপ্তিটা কীসের?

শহীদ কাদরী: এই যে আমাদের জীবন এটাই কি সত্যিকারের জীবন? মোটেও না। এর বাইরেও আলাদা একটা জীবনসত্তা আছে। সেই জীবনটাকে খোঁজার জন্যই এই অতৃপ্তি। সেজন্যই আমার সবসময় মনে হত বোহেমিয়ান জীবনটাই হল বেটার লাইফ।

আদনান সৈয়দ: আপনিতো সেই ফেলে আসা আড্ডা থেকে অনেক দূরে? আড্ডাগুলোকে মিস করেন না?

শহীদ কাদরীঃ যদি সময় মত বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারতাম তাহলে নিশ্চয়ই আবার আড্ডায় বসতাম। অবশ্য আড্ডার জন্য চাই মধ্যাকর্ষণ শক্তি। সেই মধ্যাকর্ষণ শক্তি চলে গেলে আড্ডা আর জমে না।

আদনান সৈয়দ: আপনি যে জায়গা গুলোতে আড্ডা দিতেন তারও চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ধরেন যদি আবার সুযোগ পেয়ে যান বাংলাদেশে এসে আড্ডা দেবার, পারবেন কী আবার আড্ডা জমাতে?

শহীদ কাদরীঃ আড্ডার কী কোন বয়স আছে? বন্ধুত্ব বয়সের সীমা মেনে চলে না। তবে এখনো মনে হয় আবার যদি সেই পুরনো বন্ধুদের সাথে ঠিক আগের মতই আড্ডা দেওয়া যেত! এখনতো আমি শারীরিকভাবেই অসুস্থ। তারপরও মাঝে মাঝে মনে হয় কাপড়-চোপড় পড়ে বাইরে কোথাও ধাই ধাই করে ঘুরে আসি।

আদনান সৈয়দ: শুনতে পাই আপনার নাকি এক ভবঘুরে হোমলেস আমেরিকান কবি বন্ধু জুটেছিল। ঘটনাটা কী একটু খুলে বলবেন?

শহীদ কাদরী: আমি তখন থাকি বোস্টনে। তার সাথে পরিচয় সেখানেই একটা কবিতার বইয়ের দোকানে। থাকতেন একটা হোমলেসদের শেল্টারে। প্রথম দেখে মনে হয়নি যে এই ব্যক্তিটি একজন কবি হতে পারেন। আমার সাথে পরিচয় হতেই বললেন যে তিনি একজন কবি এবং ওখানকার নামকরা একটা সাহিত্য ম্যাগাজিনে নিয়মিত কবিতা লিখেন। তারপরের সপ্তাহেই দেখি সত্যি সত্যি তার চারটা কবিতা সাহিত্য পাতায় জ্বল জ্বল করছে। ব্যাস, সেদিন থেকেই তার সাথে বন্ধুত্ব।

আদনান সৈয়দ: বাংলাদেশ থেকে কোন লেখক-সাহিত্যিক এলেই আপনি তাঁদের সাথে কথা বলতে ব্যাকুল থাকেন।

শহীদ কাদরী: বাংলাদেশের খবর জানতে চাই। বাংলাদেশের নতুন লেখকদের লেখা, তাদের চিন্তা-ভাবনা, মনন এসবের খবর নিতে চাই। এখন নতুন যাঁরা লিখছেন তাদের চিন্তা-ভাবনার সাথে নিজের চিন্তা-ভাবনার মিল অথবা অমিলগুলো খুঁজে বেড় করার চেষ্টা করি।

( নিউইয়র্ক, নভেম্বর ২০০৮)

দ্বিতীয় পর্ব
কাব্যগ্রন্থ আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও প্রসঙ্গে
বেশ কয়েকটা কবিতার খসড়া ইতিমধ্যেই করে ফেলেছি। খুব শিগগিরই এতে হাত দেব।

১৯৭৮ সালে দেশত্যাগ করার পর শহীদ কাদরী নিজেও ভাবেন নি যে তাঁর চতুর্থ কাব্য গ্রন্থ কখনো আলোর মুখ দেখবে। “তাহলে কবিতা কি আর লিখবেন না?” শুধোলেই তার সোজাসাপ্টা উত্তর ছিল, “ আরে দূর কবিতার কথা বাদ দাও, কবিতা লিখে আর কি হবে? ” কিন্তু একজন কবির ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়, ভীনদেশি আলো-হাওয়ায় ব্যস্ত জীবন-যাপন, দীপ্র আধুনিকতা, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বেহিশেবি আড্ডায় ডুবে থাকার হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও কবিতার কাছে তিনি ফিরে এসেছেন বারবার। কবিতার কাছে কবির এই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ফসল দীঘ্র ত্রিশ বছর পর এবারের বই মেলায় প্রকাশিত কবি শহীদ কাদরীর চতুর্থ কাব্য গ্রন্থ , “আমার চুম্বন গুলো পৌছে দাও”।

আদনান সৈয়দ : আপনার অনেক কবি ভক্ত ধরেই নিয়েছিলেন যে আপনি বুঝি সত্যি সত্যি কবিতাকে নির্বাসন দিয়েছেন। কিন্তু তাদের এই ধারণায় ছাই দিয়ে আপনার চতুর্থ কাব্য গ্রন্থ বের হল। এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়াটি জানতে চাই।

শহীদ কাদরী : আমার এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো বিভিন্ন সময়ের লেখা। তবে বেশির ভাগ কবিতাই লেখা হয়েছে প্রবাসী জীবনের বিভিন্ন সময়ে। কখনো ভাবিনি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু কবিতা নিয়ে চতুর্থ কাব্য গ্রন্থ বের হতে পারবে। বন্ধু জ্যোতির(কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত) উৎসাহেই গ্রন্থটি বের হল। তবে এ কথা ঠিক যে আমার একক প্রচেষ্টায় এই গ্রন্থ কখনো আলো মুখ দেখতো কিনা সন্দেহ। বন্ধু-বান্ধবদের উৎসাহ, নীরার(শহীদ কাদরীর স্ত্রী) উপর্যপুরি চাপে শেষপর্যন্ত আমি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম। গ্রন্থটি আলোর মুখ দেখল।

আদনান সৈয়দ : উত্তরাধিকার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই, এই তিনটি কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি চতুর্থ কাব্যগ্রন্থটির মুল্যায়ন আপনি কীভাবে করবেন?

শহীদ কাদরী : এই মুল্যায়নের কাজতো পাঠকের, সমালোচকের। তবে এই গ্রন্থটিতে অনেক লিরিক্যাল কবিতা স্থান পেয়েছে যা আমার আগের কাব্যগ্রন্থগুলিতে স্থান পায় নি। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে চিন্তার পরিবর্তনতো আসতেই পারে। সেদিক থেকে এই কবিতাগুলোতে নিশ্চয়ই একটু ভিন্নতার ছাপ থাকবেই।

আদনান সৈয়দ : তাহলে আমরা আশা করতে পারি খুব শিগগিরই কবি শহীদ কাদরীর পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ আমাদের হাতে এসে পৌঁছবে?

শহীদ কাদরী : আমারো সেরকম ইচ্ছে। তবে জানোইতো, শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো না, এর মধ্যে কবিতা লেখা সত্যি খুব কঠিন কাজ। তারপরও বেশ কয়েকটা কবিতার খসড়া ইতিমধ্যেই করে ফেলেছি। খুব শিগগিরই এতে হাত দিব।

আদনান সৈয়দ : দীর্ঘ তিন দশক পর আপনার চতুর্থ কাব্য গ্রন্থটি বের হল। তা এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে আপনার এই কাব্য গ্রন্থটি আপনার ভক্ত পাঠকরা কীভাবে নেবেন এ বিষয় নিয়ে কি চিন্তিত ছিলেন?

শহীদ কাদরী : দুশ্চিন্তাতো ছিলই আর তা এখনো আছে। আমার এক বন্ধু সেদিন জানালেন যে পাঠকরা নাকি গ্রন্থটি খুব ভালোবাসার সাথেই গ্রহণ করেছেন। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আর সত্যি বলতে, আমিতো এখনো ভাবতে পারি না যে মানুষজন কবি শহীদ কাদরীকে এখনো এভাবে মনে রেখেছেন।

আদনান সৈয়দ : ’আমার চুম্বন গুলো পৌছে দাও’ গ্রন্থটির নামকরণ নিয়ে দুটো কথা। অনেকেই ভেবেছিলেন যে এটা বুঝি একটা রোমান্টিক কবিতার বই। এই কাব্য গ্রন্থটির মাধ্যমে আপনি কাকে আপনার চুম্বনগুলো পৌছে দিতে চান? কে সেই আপনার প্রিয়া?

শহীদ কাদরী : তুমি ঠিকই বলেছ। এই নাম থেকে এরকম একটা ধারণা হতে পারে তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। তবে ’আমার চুম্বনগুলো পৌছে দাও’ কবিতাটিতেই কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়া আছে। আমি আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দিতে চাই আমার প্রিয় স্বদেশকে। আমার দেশ হল আমার প্রিয়া, তাকেই আমার সমস্ত ভালোবাসা আমার চুম্বনের মাধ্যমে পৌছে দিতে চাই।
(সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ৩/৯/২০০৯, নিউইয়র্ক, স্থান: শহীদ কাদরীর জ্যামাইকার বাসভবন)
সূত্র: বাংলামাটি, মে ২০০৯

Related posts:

  1. আমি নিজেকে স্বাধীন মনে করি না: যতীন সরকার
  2. আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও
  3. ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে যে যার মতো প্রবাহিত করতে চাইছে: ভাষাযোদ্ধা আব্দুল মতিন

এই বইয়ের খবর আপনার কোনো বন্ধুকে জানাতে চান? যদি তাই হয়, তাহলে নীচের প্রচ্ছদের ছবিটি রেডিও বাটন ক্লিক করে নিশ্চিত করুন:

আপনি যা লিখতে চান